রসায়নের জনক জাবির ইবনে হাইয়ান

রসায়নের জনক জাবির ইবনে হাইয়ান

রসায়ন বিজ্ঞানের ইতিহাসে জাবির ইবনে হাইয়ান একটি অতি পরিচিত নাম। তার মৌলিক আবিষ্কারের ওপরই বর্তমান রসায়ন বিজ্ঞানের অধিষ্ঠান। তার পূর্ণ নাম আবু আবদুল্লাহ জাবির ইবনে হাইয়ান ইবনে আবদুল্লাহ আল-আজাদি আততুসি আস সুফি আল-ওমাবি। তিনি আবু মুসা জাবির ইবনে হাইয়ান নামেও পরিচিত। কেউ কেউ তাকে ‘আল-হাররানি’ এবং ‘আস সুফি’ নামেও আখ্যায়িত করেছেন। ইউরোপীয় পণ্ডিতদের কাছে তিনি ‘জিবার (Geber)’ নামে পরিচিত। জাবিরের পরিচিতি নিয়ে বিভ্রাট ঘটানোর জন্য তাকে ইউরোপে ‘জিবার’ নামে আখ্যায়িত করা হয়। জাবির ইবনে হাইয়ানের নাম খুব লম্বা। নাম লম্বা হওয়ার ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে অধ্যাপক ডজ অভিমত প্রকাশ করেন যে, খুব সম্ভব তার প্রথম পুত্রের মৃত্যুর পর তিনি নিজের নামের সঙ্গে ‘আবু আবদুল্লাহ’ যুক্ত করেন। পরে অন্য পুত্র মুসার নামও নিজের নামের সঙ্গে যোগ করেন। ধারণা করা হয়, জাবিরের নামের শেষাংশ ‘ওমাবি’ আসলে ‘আমী’ শব্দের বিকৃত রূপ অথবা ভূলক্রমে এ শব্দটি তার নামের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। তখনকার দিয়ে শিয়া সমাজে সুন্নি মুসলমানদের তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করার জন্য ‘আমী’ বলা হতো। হয়তো এভাবে জাবির ইবনে হাইয়ানের নামের সঙ্গে ‘আমী’র পরিবর্তে ‘ওমাবি’ শব্দটি যুক্ত হয়েছে। বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী জাবির ইবনে হাইয়ান হলেন রসায়নের জনক। রসায়নবিদ ছাড়াও তিনি ছিলেন আলকেমিস্ট, পদার্থ বিজ্ঞানী, জ্যেতির্বিজ্ঞানী, জ্যোতিষী, প্রকৌশলী, ভূতত্ত্ববিদ, দার্শনিক, চিকিৎসক ও ফার্মাসিস্ট। জাবির জ্ঞান সাধনায় তার পূর্ববর্তী লেখক ও মনীষীদের কাছে ঋণী। তিনি এপোলনিয়াসের আধ্যাত্মবাদ, প্লেটো, সক্রেটিস, এরিস্টেটাল, পিথাগোরাস, ডেমোক্রিসাস প্রমুখের গ্রন্থের সঙ্গে পরিচিত ছিলেন। গ্রীক ভাষায় ছিলেন সু-পণ্ডিত। তিনি তার রচনাবলীতে মিসরীয় অপরসায়নবিদ জসিমাস ও হারমেস ট্রিসমেগিস্টাস এবং গ্রীক দার্শনিক ডেমোক্রিটাস, আগাথোডাইমন, প্লেটো, এরিস্টোটল, গালেন, পিথাগোরাস, সক্রেটিস, সিমপ্লিয়াস, পরফাইরি প্রমুখের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা প্রদর্শন করেছেন।



প্রাথমিক জীবনঃ

স্বভাবে জাবির ছিলেন একজন দার্শনিক। তার পিতার নাম ছিল হাইয়ান আল-আজদি। তিনি ছিলেন আরবীয় আজদি গোত্রের লোক। আরবের দক্ষিণাংশে জাবিরের পূর্ব পুরুষগণ বাস করতেন। স্থানীয় রাজনীতিতে আজাদি গোত্র সক্রিয়ভবে জড়িত ছিল। পরবতীতে জাবিরের পিতা হাইয়ান আল-আজদি আগের বাসস্থান ত্যাগ করে কুফায় গিয়ে বসবাস শুরু করেন। তিনি ছিলেন চিকিৎসক ও ওষুধ বিক্রেতা। উমাইয়া বংশের খলিফাদের নিষ্ঠুর ও অমানবিক কার্যকলাপে হাইয়ান আল-আজাদি তাদের প্রতি বিদ্বেষী মনোভাব পোষণ করতেন। উমাইয়া শাসন উৎখাতে তিনি পারস্যের কয়েকটি প্রভাবশালী বংশের সঙ্গে পরামর্শ ও ষড়যন্ত্র করার জন্য আব্বাসীয়দের দূত হিসাবে ইরানের খোরাসান প্রদেশের তুস নগরীতে গমন করেন। এ তুস নগরীতেই ৭২১ সালে বিজ্ঞানী জাবির ইবনে হাইয়ানের জন্ম।
হাইয়ান আল-আজাদির ষড়যন্ত্রের কথা দ্রুত তৎকালীন খলিফার দৃষ্টিগোচর হয়। খলিফা তাকে গ্রেফতার করে মৃত্যুদণ্ড দেন এবং তার পরিবার পরিজনদের পুনরায় দক্ষিণ আরবে প্রেরণ করেন। দক্ষিণ আরবেই জাবির ইবনে হাইয়ান শিক্ষা লাভ করেন। হারবি আল-হিমারি ছিলেন তার শিক্ষক। তার কাছে তিনি হিমারি ভাষ ছাড়াও কোরআন, গণিত ও অন্যান্য বিজ্ঞান অধ্যায়ন করেন। শিক্ষা লাভের প্রতি ছিল তার পরম আগ্রহ। পিতার পেশা আলকেমি রসায়নের প্রতি তার আগ্রহ সৃষ্টিতে বিরাট অবদান রাখে। একজন সন্ন্যাসির কাছে তিনি আলকেমির পাঠ গ্রহণ করেন। যে কোন বিষয়ের বই পেলে তিনি তা পড়ে শেষ করে ফেলতেন এবং তার ওপর গবেষণা চালাতেন। খুব অল্প সময়ের মধ্যে তিনি এখানে গণিতের বিভিন্ন শাখায় পারদর্শী হয়ে উঠেন। শিক্ষা গ্রহণ শেষ হওয়ার পর জাবির ইবনে হাইয়ান পিতার কর্মস্থল কুফা নগরীতে গিয়ে বসবাস শুরু করেন। সেখানে তিনি প্রথমে চিকিৎসা ব্যবসা আরম্ভ করেন এবং এ সূত্রেই তৎকালীন বিখ্যাত পণ্ডিত শিয়াদের ষষ্ঠ ইমাম জাফর সাদিকের অনুপ্রেরণায় তিনি রসায়ন ও চিকিৎসা বিজ্ঞান নিয়ে গবেষণা শুরু করেন।

রাজদরবারের সঙ্গে জাবিরের যোগাযোগঃ 

খালিদ ইবনে বারমাকের নেতৃত্বে বারমাকী পরিবার ছিল আব্বাসীয় খিলাফতের সমর্থক। দ্বিতীয় আব্বাসীয় খলিফা আল-মনসুরের আমলে খালিদ ইবনে বারমাক মেসোপটেমিয়ার গভর্নর নিযুক্ত হন। একবার গভর্নর খালিদের সুন্দরী দাসী মারাত্মক ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়। দেশের খ্যাতনামা চিকিৎসকগণ তার চিকিৎসা করে ব্যার্থ হন। এ সময় ডাক পড়ে জাবির ইবনে হাইয়ানের। জাবির মাত্র কয়েক দিনের চিকিৎসায় তাকে সুস্থ করে তোলেন। এতে গভর্নর খালিদ খুব সন্তুষ্ট হন এবং জাবিরের সঙ্গে তার বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে। বারমাক বংশীয় কয়েকজন মন্ত্রীর মধ্যস্থতায় তিনি রাষ্ট্রীয় কিছু সুযোগ সুবিধা লাভ করেন। তাতে তিনি রসায়ন সম্পর্কে ব্যাপক গবেষণা করার সুযোগ পান। মন্ত্র ইয়াহিয়া এবং তার পুত্র জাবিরের নিকট রসায়ন বিজ্ঞান শিক্ষা শুরু করেন। খুব অল্প দিনের মধ্যে তিনি শ্রেষ্ঠ রসায়ন বিজ্ঞানী হিসেবে পরিচিত হন। জাবির ইবনে হাইয়ান প্রতিটি বিষয়ই যুক্তির সাহায্যে বুঝার ও অনুধাবন করার চেষ্টা করতেন। প্রতিটি বিষয় পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পর্যবেক্ষণ করে তার ফলাফল লিখে রাখতেন। ৮০৩ সালে বারমাকীদের পতন ঘটলে জাবির ইবনে হাইয়ান বাগদাদের খলিফা হারুনুর রশীদের আশীর্বাদ থেকে বঞ্চিত হন। তারপর তাকে কুফায় গৃহবন্দি করা হয়।

জাবিরের পূর্বসূরি প্রথম মুসলিম আলকেমিস্টঃ

জাবিরকে নিয়ে আলোচনা করতে গেল দু’জন মুসলিম আলকেমিস্টের নাম উল্লেখ না করে পারা যায় না। এদের একজন হলেন ইমাম জাফর সাদিক এবং আরেকজন হলেন উমাইয়া যুবরাজ খালিদ ইবনে ইয়াজিদ। জাবির ছিলেন জাফর সাদিকের শিষ্য। উমাইয়া যুবরাজ খালিদের কাছে তিনি অধ্যয়ন করতেন। যুবরাজ খলিদ ইবনে ইয়াজিদ হলেন প্রথম মুসলিম রসায়নবিদ। ২০ বছর বয়সে তিনি আলকেমির জ্ঞান অর্জনে আলেক্সিন্ড্রিয়ার উদ্দেশে দামেস্ক ত্যাগ করেন। সেখানে তিনি তার খ্রিস্টান শিক্ষক স্টেফানাস ও স্টেফানাসের আশ্রয়দাতা জেরুজালেমের সন্ন্যাসি মরিনাসের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। মরিনাসের সঙ্গে তার পরিচয় ঘটার একটা কাহিনি আছে। আকস্মিকভাবে যুবরাজ খালিদ রহস্যময় একটি পাণ্ডুলিপি লাভ করেন। বিষয়বস্তু বোধগম্য না হওয়ায় তিনি বইটির গোপন তথ্য উদ্ঘাটনে পুরস্কার ঘোষণা করেন। ভুয়া আলকেমিস্ট ও প্রতারকরা এসে তার দরবারে ভিড় করে। কিন্তু কেউ সন্তোষজনক ব্যাখ্যা দিতে পারেনি। খ্রিস্টান সন্ন্যাসী মরিনাস যুবরাজ খালিদ ও তার রহস্যময় পাণ্ডুলিপি প্রাপ্তির কথা লোক মুখে শুনতে পেয়ে তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। মরিনাস বইটির পাঠোদ্ধার করতে সক্ষম হন। কিভাবে পরশ পাথর তৈরিতে বইটির জ্ঞান ব্যবহার করা যায় তিনি যুবরাজ খলিদের কাছে তা ব্যাখ্যা করেন। তার ব্যাখ্যায় তিনি সন্তুষ্ট হন এবং ভুয়া আলকেমিস্টদের হত্যা করার নির্দেশ দেন। খালিদ ইবনে ইয়াজিদ আলকেমির ওপর বেশ কয়েকটি বই লিখেছিলেন। তার পরবর্তী আলকেমিস্ট ছিলেন ইমাম জাফর সাদিক। জাফর সাদিকের পরবর্তী আলকেমিস্ট হলেন জাবির ইবনে হাইয়ান। এসময় ছিল আব্বাসীয় খলিফা হারুনুর রশীদের রাজত্বকাল। খলিফার সঙ্গে জাবিরের তেমন কোন পরিচয় বা সাক্ষাৎ হয়নি। তবে খলিফার বারমাক বংশীয় কয়েকজন মন্ত্রীর সঙ্গে তার গভীর সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। ইমাম জাফর সাদিকই জাবিরকে বারমাক বংশীয় কয়েকজন মন্ত্রীর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন।

প্রাচীন আলকেমিঃ

‘আলকেমি’ হলো রসায়নের আদি উৎস। সর্বপ্রথম আলকেমি চর্চা কোথায় শুরু হয়েছিল সে ব্যাপারে বিতর্ক রয়েছে। বিজ্ঞানীদের একটি অংশ দাবি করেছেন, প্রাচীনকালে চীনে তাও ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে এ শাস্ত্রের উদ্ভব ঘটেছিল। আরেকদল বিজ্ঞানী বলেছেন, চীনা তাও নয়, গ্রীকে বিজ্ঞানী আরিয়াস হলেন আলকেমির উদ্দোক্তা। তিনিই প্রথম পরশ পাথর নিয়ে গবেষণা চালিয়েছিলেন। পক্ষান্তরে জাবির ইবনে হাইয়ান প্রাচীন মিসরের হারমেস ট্রিসমেগিস্টাস, আগাথোডাইমন ও পিথাগোরাসকে আলকেমির প্রাণপুরুষ এবং সক্রেটিসকে সব দর্শনের পিতামাতা হিসাবে উল্লেখ করেছেন। তিনি নিশ্চিত করেন যে, সাধারণ মানুষের অজ্ঞতার জন্য যাতে এ জ্ঞান ফাঁস হয়ে না যায় সেজন্য সক্রেটিস আলকেমি নিয়ে লেখালিখির বিপক্ষে ছিলেন। জাবির গালেনকেও আলকেমিস্ট হিসাবে উল্লেখ করেছেন।
মিসর হলো আলকেমির জন্মস্থান। মিসরীয় ধাতু শিল্পী ও জহুরিয়া ধাতুকে এমন একটি রূপ দেয়ার চেষ্টা করতো যাতে তাকে স্বর্ণের মতো দেখায়। তারা ধাতুকে অন্য ধাতুতে রূপান্তরের ফর্মুলা গোপন রাখতো। এ ব্যাপারে ছিল তাদের একচেটিয়াত্ব। আলকেমির জন্মের ব্যাপারে দ্বিমত পোষণ করলেও সবাই এ প্রশ্নে একমত যে, মিসর সিরীয় ভাষায় অনূদিত গ্রীক গ্রন্থ এবং পারস্যের মধ্য দিয়ে ইসলামী বিশ্বে এ ধারণা বিস্তার লাভ করেছে। হায়ুলি, আতিস, ইয়াস, আছালিয়া, ইকসার, কাম্বার প্রভৃতি গ্রীক শব্দগুলো আরবীয় আলকেমিতে ঠাঁই পাওয়ায় বোঝা যাচ্ছে, আরবরা মূলত গ্রীক সূত্র থেকে তাদের আলকেমির জ্ঞান লাভ করেছে। তবে মিসরের আলেক্সন্ড্রিয়ার সঙ্গে যোগাযোগের মধ্য দিয়ে মুসলমানরা প্রথম আলকেমির সংস্পশে আসে।
মিসরের ভূমধ্যসাগরীয় বন্দর নগরী আলেক্সান্ড্রিয়া অভিযানকালে সেখানকার লাইব্রেরির সকল গ্রীক পাণ্ডুলিপি আরবদের হস্তগত হয়। ধারণ করা হয় যে, আরবদের হস্তগত পাণ্ডুলিপিগুলোর মধ্যে আলকেমি সংক্রান্ত মিসরীয় পাণ্ডুলিপিও ছিল। আর তারই সূত্র ধরে মিসরীয় আলকেমি আরব উপদ্বীপে প্রবেশ করে। রসায়নের ইতিহাস পাঠ করলে দেখা যায়, প্রাচীন মিসরের হারমেস ট্রিসমেগিস্টাস হলেন আলকেমির জনক। তৃতীয় শতাব্দীতে রোমান সম্রাট ডায়োক্লেশিয়ান মিসরের আলকেমি সংক্রান্ত সব কর্ম ধ্বংস করার নির্দেশ দেন। আলকেমির জ্ঞান কাজে লাগিয়ে কেউ যাতে তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করার মতো ধন সম্পদের অধিকারী হতে না পারে সেজন্য তিনি এমন নির্দেশ দিয়েছিলেন। সম্রাট ডায়োক্লেশিয়ানের ধ্বংসলীলা থেকে হারমেসের মাত্র দু’টি বই রক্ষা পায়। একটি বইয়ের নাম ছিল ‘এমার‌্যাল্ড’ এবং আরেকটি বইয়ের নাম ‘ডিভাইন পিম্যান্ডার’।
‘এমার‌্যাল্ড টেবলেট’কে আলকেমির মূল উৎস হিসাবে বিবেচনা করা হয়। ল্যাটিন ভাষীদের কাছে বইটি ‘স্মারাগদাইন টেবলেট’ বা ‘তাবুলা স্মারাগদিনা’ শিরোনামে পরিচিত। বইটির ইংরেজি নাম ‘সিক্রেট অব টেবলেট’  এবং আরবী অনুবাদে বইটির নামকরণ করা হয় ‘কিতাব সার আল-আসরার’। আরবী ভাষীদের কাছে হারমেস ছিলেন ‘হারমেস আল-মুতালাত বি আল-হিকমা’ নামে পরিচিত। পবিত্র কোরআনে হারমেসের নামের কোন উল্লেখ নেই। তবে হযরত মোহাম্মদ (সা.) মদিনায় হিযরত করার পর মুসলমানরা হারমেসকে হযরত ইউসূফ (আ.) হিসাবে শনাক্ত করে। অন্যান্য ধর্মাবলম্বীরা তাকে হযরত ইদ্রিস (আ.) হিসাবে মনে করে। হারমেস ছিলেন হযরত মূসা (আ.) এর সমসাময়িক। তার দেশবাসী বেবিলন থেকে তাকে মিসরে নির্বাসনে পাঠায়। সেখানে তিনি রাজা হন। খ্রিস্টপূর্ব ১৯০০ সালের দিকে তিনি মিসরের রাজা ছিলেন। মিসরে নির্বাসিত হয়ে সে দেশের রাজা হিসাবে অভিষিক্ত হওয়ার ঘটনা প্রমাণ করছে যে, হারমেস হযরত ইউসূফ (আ.) ছাড়া আর কেউ নন। হারমেসের নামের অংশ ‘ট্রিসমেগিস্টাস’ - এর অর্থ হলো গোটা পৃথিবীর তিন ভাগ জ্ঞানের অধিকরী। ভাগগুলো হলোঃ আলকেমি, এস্ট্রলজি এবং থিওরজি বা অতিমানবীয় ক্ষমতা।
নবম শতাব্দীতে আরবীতে হারমেসের দুর্লভ বইটি অনুবাদ করেছিলেন ইয়াহিয়া ইবনে বাতরিক। মুসলিম রসায়নবিদ আল-রাজি ‘কিতাব সার আল-আসরার’ নামে একটি বই লিখেছিলেন। তার বইটি হারমেসের বইয়ের অনুবাদ নয়। তবে জাবির ইবনে হাইয়ানের ‘কিতাব উসতুকুস আল-উস আল-ছানি’তে (The Secret of Creation) হারমেসের বইটি নতুন রূপে আত্মপ্রকাশ করে। তার বইটি ছিল হারমেসের বইয়ের একটি ভাষ্য।

আলকেমির তত্ত্ব গোপন রাখার অভিনব কৌশলঃ

জাবির আলকেমির তত্ত্ব গোপনে রাখার অভিনব কৌশল হিসাবে তার বইগুলো দুর্বোধ্য ভাষায় লিখতেন। এ ব্যাপারে তিনি গ্রীক আলকেমিস্ট আরিয়াসকে অনুসরণ করেন। আরিয়াস তার আলকেমি বিষয়ক বইগুলো অত্যন্ত দুর্বোধ্য ভাষায় লিখতেন। সাবধানতার জন্য তিনি এ কৌশল গ্রহণ করেছিলেন। জাবিরের গুরু ইমাম জাফর সাদিক তাকে সতর্ক করে দিয়েছিলেন যে, আলকেমির রহস্য দুষ্ট লোকের হাতে হস্তান্তরিত হলে বিপর্যয় ঘটতে পারে। যে কেউ ক্ষমতা ও প্রতিপত্তি লাভে এ জ্ঞান ব্যবহার করতে পারে। তাই তিনি বই লিখার সময় সতর্ক থাকতেন। সতর্কতা অবলম্বনে তিনি যে নীতী অবলম্বন করেছিলেন তা ছিল তার ভাষায় ‘তাবদিদ আল-ইলম’ বা জ্ঞান গোপন রাখার নীতি। তিনি সব রহস্য একসঙ্গে একটি বইয়ে প্রকাশ করার নীতিতে বিশ্বাস করতেন না। প্রতিটি বইয়ে একটু একটু করে রহস্য প্রকাশ করতেন। এজন্য তিনি বই লিখেছেন অসংখ্য। তিনি আলকেমির জ্ঞানকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রেখে যান। এজন্য তার বইয়ের পাঠোদ্ধার করা কঠিন। আলকেমির জ্ঞান গোপন রাখার উদ্দেশ্যে জাবিরের অনুসৃত নীতি তার জন্য কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে। ‘ব্রিদ্রেন অব পিউরিটি’ নামে শিয়া ইসমাঈলীয়দের একটি গোপন দল তার বইয়ের পরিচয় গোপন করার হীন চক্রান্তে লিপ্ত হয়। তারা তার অনেক বই ধ্বংস করে ফেলেছে। তাদের চক্রান্তে জাবিরের বইয়ের পরিচয় নিয়ে মারাত্মক বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়েছে।

আলকেমির প্রতি খ্রিস্টানদের সন্দেহঃ 

আলকেমিকে খ্রিস্টানরা সুনজরে দেখতো না। তারা মনে করতো আলকেমির জ্ঞান অশুভ। তারা এ জ্ঞান ভুল হাতে পড়ার আশংকা করতো। অনুরূপ আশংকা থেকে খ্রিস্টানরা ৩৯১ সালে মিসরের আলেক্সান্ড্রিয়ার একটি বৃহত্তম লাইব্রেরি পুড়িয়ে দেয়। আলেক্সান্ড্রিয়া ছিল ভূমধ্যসাগরের উপকূলে ‘কুইন সিটি’ বা রানী সদৃশ শহর। গ্রীসে ও মিসরীয় আলকেমির ধারণা ও তত্ত্বগুলো এ শহরে স্রোতের মতো ভেসে আসে। এখানকার লাইব্রেরিগুলোতে আলকেমিস্টদের প্রচুর বইপত্র সংরক্ষিত ছিল। খ্রিস্টানরা আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দিলেও আলেক্সান্ড্রিয়া আলকেমির জ্ঞান থেকে মুক্ত হতে পারেনি।

আলকেমি থেকে কেমিস্ট্রিঃ

‘আলকেমি’ হল রসায়নের পূর্বসূরি। একটি ভাষ্যে বলা হয়েছে, আরবী ‘কেম’ অথবা ‘কিমিয়া’ শব্দ থেকে ‘আলকেমি’ শব্দটি উৎপত্তি হয়েছে। আরেকটি ভাষ্যে বলা হয়, মিসরীয় ‘কেমি’ থেকে আরবী ‘আলকেমি’ শব্দটির উৎপত্তি হয়েছে। ‘কেমি’ অর্থ হলো ‘কৃষ্ণ’। মিসরের কালো ধাতুকে মূল্যবান ধাতুতে রূপান্তরিত করা হতো বলে সে দেশের আরেক নাম ছিল ‘ব্ল্যাক ল্যান্ড’ বা কৃষ্ণ ভূখণ্ড’। আরবী ‘আল’ শব্দটির ইংরেজি করলে অর্থ দাঁড়ায় ‘দ্যা’ এবং ‘কিমিয়া’ শব্দটি ‘কেমিস্ট্রি’ বা ‘রসায়ন’। ‘কিমিয়া শব্দের আরবী অর্থ হলো ‘পরিমাণ’। প্রাথমিকভাবে মুসলিম বিজ্ঞানীরা ধাতু পরিমাপে আরবীতে ‘পরিমাণ’ শব্দটিই ব্যবহার করতেন। তাই এ শাস্ত্র ‘রসায়ন’ বা ‘কেমিস্ট্রি’ নামে পরিচিত হয়ে উঠে। রসায়নে মুসলিম যুগ শুরু হওয়ার আগে পুরাকালের রূপকথার ওপর এ শাস্ত্র নির্ভরশীল ছিল। তখন বিশ্বাস করা হতো, সস্তা ধাতুকে মূল্যবান ধাতুতে রূপান্তরিত করা যায়। প্রাচীন গ্রীক বিজ্ঞানীরা মনে করতেন, স্বর্ণ, রৌপ্য, তামা, লোহা, সীসা ও টিনের মতো আলমেনটার্ক ধাতুগুলো একই প্রকৃতির এবং তাপ, ঠান্ডা, শুষ্কতা ও আর্দ্রতার জন্য তাদের গুণ ভিন্ন ভিন্ন। অতএব পঞ্চম ধাতু বা এলিক্সারের সহায়তায় একটি ধাতুকে অন্য ধাতুতে রূপান্তর করা সম্ভব। কোন কোন প্রাচীন বিজ্ঞানী আরো ধারণা করতেন, ঐন্দ্রজালিক বস্তু ‘ফিলসোফার্স স্টোন’ বা পরশ পাথর তৈরি করা সম্ভব হলে জরা বার্ধক্য দূর হবে এবং জীবন দীর্ঘায়িত হবে। তুর্কি ভাষায় এলিক্সারকে বলা হতো ‘আবে হায়াত’। আবে হায়াত তৈরি করাই ছিল আলকেমির লক্ষ্য। সে যুগের রসায়নবিদদের লক্ষ্য ছিল পরম পাথরের সন্ধান লাভ। বিজ্ঞানীরা অন্ধভাবে এ রূপকথার বস্তুটির পেছনে ছুটেও কোন কূল কিনারা করতে পারেননি। মুসলিম বিজ্ঞানীরা রসায়নকে এ কুসংস্কার থেকে মুক্ত করেন।

জাবিরের বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারঃ

জাবিরকে পরশ পাথরের মোহ পেয়ে বসেছিল। তবে তিনি বৈজ্ঞানিক উপায়ে চেষ্টা করেছেন। কোন কোন সূত্র দাবি করছে, তিনি তার প্রচেষ্টায় সফল হয়েছিলেন। জাবির এলিক্সারের ‍গুণাবলী ও কার্যপ্রণালী বর্ণনা করলেও জিনিসটি দেখতে কেমন তিনি তার আভাস দেননি। আরবীতে নাইট্রিক (Nitric) শব্দটিকে বলা হতো ‘নাট্রন’। জাবির ‘কিতাবুল ইসতিতমাম’ - এর ২৩ তম অধ্যায়ে নাইট্রিক এসিড প্রস্তুত করার ফর্মুলা বর্ণনা করেছেন। নাইট্রিক এসিড দিয়ে স্বর্ণ গলানোর ফর্মুলা এবং এসিড দিয়ে স্বর্ণ থেকে রৌপ পৃথক করার প্রণালী তিনিই আবিষ্কার করেন। সোনা একটি রাসায়নিক উপাদান হিসাবে ব্যবহৃত হয়ে আসছিল। কিন্তু বিশুদ্ধ অবস্থায় সোনা পাওয়া যেত না। অন্য ধাতুর সঙ্গে মিশ্রিত অবস্থায় পাওয়া যেত। মিশ্রিত ধাতু থেকে সোনা পৃথকীকরণের কৌশল জাবিরের আগে অন্য কেউ বের করতে পারেননি। তিনিই প্রথম সীসার সঙ্গে মিশিয়ে সোনা বিশুদ্ধ করার উপায় খুঁজে বের করেন। এ উপায়কে বলা হতো ‘কুপেলেশন’ (Cupellation) প্রণালী।
জাবিরই সর্বপ্রথম দেখান যে, সিলভার নাইট্রেট দ্রবণের সঙ্গে সাধারণ লবণ যোগ করলে একটি ঘোলাটে অধঃক্ষেপ প্রস্তুত হয়। তা থেকে তিনি এ সিদ্ধান্তে পৌছান যে, এভাবে রাসায়নিক যৌগিক পদার্থে বিদ্যমান রৌপ্যের অস্তিত্ব নিরূপণ করা সম্ভব। নাইট্রিক এসিড ও হাইড্রোক্লোরিক এসিডে স্বর্ণ গলানোর পদার্থটির নাম ‘একোয়া রিজিয়া’ (Aqua Regia)। এ নামটি জাবিরের দেয়া। উপাদানটি স্বর্ণকে দ্রবীভূত করতে পারে। পাতন, উর্ধ্বপাতন, পরিস্রাবণ, দ্রবণ, কেলাসন, ভস্মীকরণ, গলন, বাষ্পীভবন ইত্যাদি রাসায়নিক সংশ্লেষণ এবং তার ফলাফল তিনি বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করেছেন। জাবির কস্টিক সোডা, চামড়া ও কাপড়ে রং করার প্রণালী, লোহা, ওয়াটারপ্রুফ কাপড়, বার্ণিশ করার উপায়, সোনার পানিতে পুস্তকে নাম লেখার জন্য লোহার ব্যবহার ইত্যাদি আবিষ্কার করেন। এলেমবিক ও বিশেষ ধরনের কাঁচের পাত্রসহ আধুনিক গবেষণাগারে ব্যবহৃত অন্তত ২০ টি বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতির আবিষ্কারক হলেন তিনি। ‘এলেমবিক’ নামটি তার দেয়া। এলেমবিকের অংশ হিসাবে পাতনের জন্য তিনি বকযন্ত্র আবিষ্কার করেন। পরবর্তীকালে মুসলিম বিজ্ঞানীরা তার যন্ত্রটি ব্যাপকভাবে ব্যবহার করতেন এবং ১৫৭০ সালে এ যন্ত্র ইউরোপে চালু করা হয়। ইমাম জাফর আল-সাদিকের আগ্রহে সাড়া দিয়ে জাবির আগুন প্রতিরোধ সক্ষম বিশেষ ধরণের কাগজ প্রস্তুত করেছিলেন। বিশেষ ধরণের একটি কালিও তিনি আবিষ্কার করেছিলেন। এ কালির লেখা রাতের অন্ধকারে পাঠ করা যেতো। তামার যে কোনো যৌগিক পদার্থ আগুনের শিখায় উজ্জ্বল নীল আলো বিকিরণ করে। জাবির তামার এ বিশেষ গুণের সঙ্গে পরিচিত ছিলেন।


চিত্রঃ- জাবির ইবনে হাইয়ানের আবিষ্কৃত বক্রনল।

তামার এ গুণ ব্যবহার করে তিনি উল্লেখিত কালি তৈরি করেছিলেন। নাইট্রিক এসিড সংশ্লিষ্ট কয়েকটি যৌগিক পদার্থও তিনি প্রস্তুত করতে সক্ষম হয়েছিলেন। এসব যৌগিক পদার্থের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো সিলভার নাইট্রেট ও মারকিউরিক ক্লোরাইড। জাবির প্রথম পাতন প্রণালীর মধ্য দিয়ে ভিনিগার থেকে এসিটিক এসিড ঘনীভূত করেছিলেন। রৌপ্যের সঙ্গে নাইট্রিক এডিসের সংমিশ্রণে উৎপন্ন যৌগিক পদার্থের নাম সিলভার নাইট্রেট। পারদের সঙ্গে হাইড্রোক্লোরিক এসিডের সংমিশ্রণে উৎপন্ন হয় মারকিউরিক ক্লোরাইড। জাবিরের বিভিন্ন গ্রন্থ পাঠ করলে জানা যায়, তিনি সালাফিউরিক এসিড, নাইট্রিক এসিড ও হাইড্রোক্লোরাইড এসিড প্রস্তুত করেছিলেন এবং এসিডের নাম দিয়েছিলেন ‘আলযাজাজ তেল’। জাবির গন্ধককে ক্ষারের সঙ্গে তাপ দিয়ে লিভার অব সালফর এবং মিল্ক অব সালফার তৈরি করেছিলেন। তিনি বিশুদ্ধ ভিট্রিওল, এলামস, আলকালি, নিশাদল, সল্টপিটার, লীড এসিটেট, বিষাক্ত অক্সাইড-ও প্রস্তুত করেছিলেন। অন্য ধাতুর সঙ্গে মিশ্র স্বর্ণকে মীগারের সঙ্গে মিশিয়ে স্বর্ণ বিশুদ্ধ করার পদ্ধতি তিনিই আবিষ্কার করেন। তিনি রঞ্জক ও অন্যান্য পদার্থের রাসায়নিক বিশ্লেষণে তার অর্জিত জ্ঞান ব্যবহার করেছিলেন। তিনি বৈজ্ঞানিকভাবে রঙ্গীন কাঁচ তৈরির ৪৬ টি মৌলিক প্রণালীর বর্ণনা দিয়েছেন। আর্সেনিক ও এন্টিমনি কিভাবে প্রস্তুত করা যায় এবং ধাতু কিভাবে বিশুদ্ধ করতে হয় তিনি তারও বিস্তারিত ব্যাখ্যা দিয়েছেন। জাবির প্রথম স্বর্ণ, রৌপ্য, টিন, সীসা, পারদ, লোহা ও তামা - এ ৭ টি ধাতুকে শ্রেণীকরণ করেন। তিনি তার ‘কিতাব আল-দুরা আল-মাকনুনা’য় (The Book of the Hidden Peral) প্রথম কৃত্রিম মুক্তা ও মূল্যবান রত্ন উৎপাদন এবং বিবর্ণ মুক্তা পরিশোধন প্রণালী বর্ণনা করেছেন। একই বইয়ে তিনি পনির থেকে সিরিশ তৈরির বর্ণনা দিয়েছেন। জাবির বর্ম (জাওরাসিন), শিরোস্ত্রান (বিদ) ও ঢাল (দারাক) হিসাবে ব্যবহারের জন্য প্লেটযুক্ত শক্ত আচ্ছাদন উদ্ভাবন করেন। জাবির প্রসাধন শিল্প প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। উদ্ভিদ থেকে সংগৃহীত সুগন্ধি দিয়ে তিনি প্রসাধনী তৈরি করতেন। জাবিরের এসব আবিষ্কার আধুনিক রসায়নের ভিত্তি হিসাবে কাজ করছে।
গবেষণাগারে ‘তাকউইন’ বা কৃত্রিম জীবন সৃষ্টি করা ছিল আলকেমি নিয়ে জাবিরের গবেষণার লক্ষ্য। তার গবেষণাগারে বৃশ্চিক, সাপ এমনকি মানুষের মতো প্রাণী সৃষ্টির রেসিপি পর্যন্ত খুঁজে পাওয়া যায়। জাবির এসব রেসিপি দিয়ে কী করতে চেয়েছিলেন তা অস্পষ্ট। আলকেমি নিয়ে তার গবেষণার ভিত্তি ছিল গিথাগোরাসীয় ও নব্য প্লেটোবাদী ব্যবস্থার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নিউমারলোজি। তিনি আরবী বর্ণমালার সংখ্যার মানের সাহায্যে পদার্থের প্রকৃতি ও গুণের সংজ্ঞা দিতেন।
উষ্ণ পানীয় বা ওয়াইন সম্পর্কেও তার ধারণা ছিল। আরবী ‘আল-কোহল’ থেকে ‘এলকোহল’ শব্দটি এসেছে। এলকোহল হলো ওয়াইন বা মদ তৈরির উপাদান। ‘কিতাব আল-তারাফুক ফি আল-আতর’ (দ্যা বুক অব দ্যা কেমিস্ট্রি অব পারফিউম) - এ জাবির ওয়াইন পাতনের কথা উল্লেখ করেছেন। ‘কিতাব ইখরাজ মাফি আল-ফিল’ - এ তিনি বিশ্বে প্রথম এলকোহলের বর্ণনা দেন। ইসলামে মদ পান নিষিদ্ধ হলেও ওষুধ, রাসায়নিক ও ওষুধ শিল্পে ওয়াইন ব্যবহার করা হতো। আরব বিশ্বে বসবাসকারী অমুসলিমরা মদ পান করতো। মদ প্রস্তুতে জাবিরের অবদান নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে মুসলিম বিজ্ঞান লেখক আহমদ ওয়াই হাসান লিখেছেন, ‘The distillation of wine and the properties of alcohol were known to Islamic chemists from the eight century. The prohibition of wine in Islam did not mean that wine was not produced or consumed or that Arab alchemists did not subject it to their distillation processes. Jabir Ibn Hayyan described a cooling technique which can be applied to distillation of alcohol.’
অর্থাৎ ‘অষ্টম শতাব্দী থেকে মুসলিম আলকেমিস্টরা মদ ও এলকোহলের ধর্মের সঙ্গে পরিচিত ছিলেন। ইসলামে মদ নিষিদ্ধ হওয়ার মানে এই নয় যে, মদ তৈরি অথবা পান করা হতো না কিংবা আরব আলকেমিস্টরা তাদের পাতন প্রক্রিয়ায় তা ব্যবহার করতেন না। জাবির ইবনে হাইয়ান একটি শীতলীকরণ কৌশলের বর্ণনা দিয়েছিলেন যা এলকোহল পাতনে প্রয়োগ করা যেতো।’

পরশ পাথর সম্পর্কে জাবিরের বর্ণনাঃ

‘কিতাবুল ইসতিতমাম’ - এর দ্বিতীয় পরিচ্ছেদে জাবির পরশ পাথর নিয়ে আলোচনা করেছেন। আলোচনা করতে গিয়ে তিনি পরশ পাথরের রাসায়নিক উপাদানকে ‘দেহ’ হিসাবে বর্ণনা করেছেন। তিনি লিখেছেন, ‘বর্তমানে বিজ্ঞানীগণ সাদা ও লাল পরশ পাথরের কথা বলছেন। আমরা মনে করি এটা সত্যি। কেননা যে পরশ পাথর তৈরি করা হয় তা সাদা বা লাল যাই হোক, তাতে পারদ ও গন্ধক ছাড়া অন্য কিছু নেই। একটি অন্যটি ছাড়া কাজ করতে পারে না বা থাকতে পারে না। সেজন্য বিজ্ঞানীরা একে একটি পাথক বলে আখ্যায়িত করেছেন যদিও বহু দেহ থেকে এ জিনিস তৈরি হয়। যে জিনিসের মধ্যে দেহ নেই তা থেকে পরশ পাথর তৈরি করার আশা বোকামী এবং আত্মম্ভরিতা ছাড়া আর কিছু নয়। কোনো কোনো আত্মম্ভরী লোক এমনি বলে থাকে। বিজ্ঞানীরা কিন্তু কোনদিনই এমন কথা বলেননি যদিও তারা রূপকের মাধ্যমে অনেক কিছুই বলছেন। সব ধাতব বস্তুই পারদ ও গন্ধকে তৈরি। দৈবক্রমে তারা শুদ্ধ বা অশুদ্ধ হয়, তবে প্রকৃতিগতভাবে নয়। সেজন্য সুবিধা মতো তার মধ্যে থেকে অবিশুদ্ধতা বের করে নেয়া যেতে পারে। কেননা দৈব ঘটনাকে কাজে লাগানো অসম্ভব নয়। প্রস্তুতিকরণের আসল কথা হলো দেহের পূর্ণতা। তার মধ্যে যেসব জিনিস অতিরিক্ত মাত্রায় আছে সেগুলো বের করে নেয়া আর যেগুলো কম আছে সেগুলো তার মধ্যে প্রবিষ্ট করে দেয়া। প্রস্তুতিকরণের উপায়ের ভিন্নতা নির্ভর করছে জিনিসের ভিন্নতার ওপর। অভিজ্ঞতা থেকে বিভিন্ন উপায়ও বের হয়ে এসেছে। যেমন-ভস্মীকরণ, উর্ধ্বপাতন, ইসতিনজাল, দ্রবণ, ঘন জমান, ঘনীভূতকরণ এবং তাশমি। এসব কাজই প্রস্তুকিতরণে সাহায্য করে।’

জাবির বিশ্বাস করতেন, কোনো একটি ধাতুর গুণ পরিবর্তন করে ফেললে তা ভিন্ন একটি ধাতুতে পরিণত হবে। এজন্য প্রয়োজন এলিক্সারের মতো অনুঘটক। এলিক্সারের সহায়তায় মৌলিক পদার্থের গুনাবলী পরিবর্তন করা সম্ভব। ধাতুর এ ধরনের রূপান্তর ইউরোপীয় আলকেমিতে পরশ পাথর হিসাবে পরিচিতি লাভ করে। ‘বুক অব স্টোন’ - এ জাবির গভীর রহস্যময়তার আবরণে তার যুক্তি পেশ করেছেন। বইটিতে তিনি পরশ মনি লাভে মরুভূমিতে নিঃসঙ্গ অবস্থায় নির্ভূলভাবে দীর্ঘ সময় বিশেষ ধরনের নামাজ আদায় করে আল্লাহর কাছে মোনাজাত করার পরামর্শ দিয়েছেন।

রসায়ন নিয়ে গবেষণাঃ

জাবির যে সময় জন্ম নিয়েছিলেন সে সময় রসায়নকে জাদুবিদ্যা অথবা আধ্যাত্মিকতাবাদের নিদর্শন বলে মনে করা হতো। এমন ধরণা থেকে তাকে সুফি বলে আখ্যায়িত করা হতো। আসলে সুফিরাই হলেন ইসলামে রসায়নের পুরোধা ব্যক্তিত্ব। জাবির ইবনে হাইয়ানের মূল কাজ ছিল রসায়ন নিয়ে গবেষণা। তিনি পরীক্ষা নিরীক্ষার ওপর জোর দিতেন এবং আলকেমিকে কুসংস্কার থেকে মুক্ত করে তাকে একটি বিজ্ঞানে রূপান্তরিত করেন। তিনি আলকেমির দীর্ঘ ইতিহাসের ওপর আলোকপাত করেন। জাবির ঘোষণা করেন যে, প্রাকৃতিক নিয়মগুলো অনুকরণ করার সামর্থ্য মানুষের আছে। তিনি তার জীবনের অধিকাংশ সময় কাটিয়েছেন বাগদাদে। বাগাদাদে তার রসায়নাগার ছিল।
জাবিরের অবদান মৌলিক। তিনি বস্তুজগৎকে প্রধানত তিনটি ভাগে বিভক্ত করেন। প্রথম ভাগে স্পিরিট, দ্বিতীয় ভাগে ধাতু এবং তৃতীয় ভাগে যৌগিক পদার্থ। তার এ আবিষ্কারের ওপর নির্ভর করেই পরবর্তী বিজ্ঞানীরা বস্তুজগৎকে তিন ভাগে ভাগ করেছেন। যথা - গ্যাসীয়, বায়ুবীয় ও কঠিন। জাবির এমন সব বস্তু বিশ্ব সভ্যতার সামনে তুলে ধরেন যেগুলোকে তাপ দিলে বাষ্পায়িত হয়। এ পর্যায়ে রয়েছে কর্পূর, আর্সেনিক ও এমোনিয়া ক্লোরাইড। তিনি কিছু মিশ্র ও যৌগিক পদার্থকে অনায়সে চূর্ণে পরিণত করে দেখিয়েছেন। সোনা, রূপা, তামা, লোহা, দস্তা প্রভৃতিকে তিনি নির্ভেজাল বস্তুর পর্যায়ে ফেলেছেন। তার মতে, সোনা, রূপা, লোহা প্রভৃতি ধাতুর মৌলিকত্ব নেই। এসব ধাতু পারদ আর গন্ধকের সমন্বয়ে গঠিত। ধাতু খনিতে যে নিয়মে গঠিত হয় একই নিয়মে মানুষও ঐসব ধাতু তৈরি করতে পারে। সীসা থেকে সীসা তৈরি করার প্রক্রিয়া সম্পর্কে তিনি তার ‘কিতাবুল খাওয়াস’ - এ লিখেছেন, ‘আধা সের সীসাম্ল এবং এক পোয়া সোডা লও। দুটি একসঙ্গে গুঁড়ো করে মিশিয়ে নাও। এ দুটির মিশ্রণকে তেল দিয়ে ভালো করে মেখে নাও। এবার তেলে মাখানো গুঁড়োগুলোকে তলায় ছিদ্রবিশিষ্ট একটি পাত্রে রেখে দাও। এই পাত্র অন্য একটি পাত্রের ওপর রেখে ভালো করে তাপ দিতে  থাকো। খানিকক্ষণ তাপ দেয়ার পর দেখবে বিশুদ্ধ সাদা ধাতু নিচের পাত্রে জমা হচ্ছে।’ 
একই গ্রন্থে তিনি শ্বেত সীসা প্রস্তুত করার প্রণালী সম্পর্কে লিখেছেন, ‘আধা সের সীসাম্ল লও। এগুলোকে ভালো করে গুঁড়ো করে দু’সের পরিমাণ ভিনিগার ঢেলে দিয়ে জ্বাল দিতে থাকো। জ্বাল দিতে দিতে ভিনিগার কমে যখন এক সের আন্দাজে দাঁড়াবে তখন পাত্রটি নামিয়ে ঠাণ্ডা হতে দাও। এখন অন্য একটি পাত্রে আধা সের আন্দাজ সোডা দু’সের পরিমাণ পরিষ্কার পানির সঙ্গে মিশিয়ে জ্বাল দাও। জ্বাল দিতে দিতে যখন পানির পরিমাণ কমে আধা সের আন্দাজ দাঁড়াবে তখন তা নামিয়ে ঠাণ্ডা হতে দাও। দু’টি পাত্রে রক্ষিত তরল পদার্থ এবার ফিল্টার করে নাও। প্রয়োজন হলে বারবার ফিল্টার করে নিতে হবে যাতে তরল পদার্থের মধ্যে কোনো রকম ক্লেদ বা ময়লা না থাকে। এবার দু’টি পরিষ্কার দ্রবণকে আস্তে আস্তে একত্রে মিশাতে থাকো। সোডার দ্রবণ আস্তে আস্তে সীসাম্লের মধ্যে দিয়ে ঢেলে দিয়ে নাড়তে থাকো। এই মিশ্রণে একটি সাদা সুন্দর জিনিস তৈরি হবে। এ সাদা জিনিসিটি দ্রবণকে ঘোলাটে করে ফেলবে। আস্তে আস্তে জিনিসটি তলায় থিতিয়ে যাবে। সবটুকু নিচে থিতিয়ে গেলে ওপরের পানি ধীরে ধীরে ঢেলে ফেলো। নিচের থিতানো জিনিসগুলো তুলো নিয়ে শুকাতে দাও। তখন তুষার শুভ্র একটি জিনিস পাওয়া যাবে। এই জিনিসটিই হলো শ্বেত সীসা।’
পারদকে লাল কঠিন পদার্থে পরিণত করার প্রক্রিয়া সম্পর্কে তিনি লিখেছেন, ‘একটি গোলাকার কাঁচের পাত্রে খানিকটা পারদ লও। অন্য একটি মাটির পাত্রে খানিকটা গুঁড়ো করা হলুদ গন্ধক নাও। পারদ সমেত কাঁচের পাত্রটিকে মাটির পাত্রের ভেতর গন্ধকের ওপর বসিয়ে দাও। এবার কাঁচের পাত্রটির চারপাশে আরো গন্ধক দিয়ে মাটির পাত্রটিকে ভর্তি করতে থাকো যতক্ষণ না গন্ধক কাঁচের পাত্রের গলা পর্যন্ত পৌঁছায়। এভাবে গন্ধক দিয়ে ভর্তি করার পর মাটির পাত্রের মুখ ভালো করে বন্ধ করে নাও। এবার পাত্রটি চুলার ওপর বসিয়ে দিয়ে এক রাত জ্বাল দাও। পরদিন পাত্রটিকে চুলা থেকে উঠিয়ে নিয়ে মুখ খুললেই দেখতে পাবে পারদ একটি রক্তবর্ণ কঠিন পদার্থে পরিণত হয়েছে। তার রং হবে টকটকে রক্তের মতো লাল। এ জিনিসটিকে লোকে রক্ত পারদ বলে।’
জাবির নাইট্রিক এসিডের নাম দিয়েছিলেন ‘মাআল লুলাল’ বা দ্রাবক পানি। ‘কিতাবুল ইসতিতমাম’ - এ তিনি নাইট্রিক এসিড প্রস্তুত প্রনালীর বর্ণনা দিয়েছেন। এ প্রনালী সম্পর্কে তিনি লিখেছেন, ‘আধা সেন পরিমাণ সাইপ্রাসের ভিট্রিওল নাও। তার সঙ্গে এক সের পরিমাণ সল্ট পিটার এবং সিকি পরিমাণ ইয়েমেনী ফিটকারি নাও। সবগুলোকে একসঙ্গে একত্রে একটি পাত্রে ভালো করে জ্বাল দিতে থাকো যতক্ষন না এলেমবিক লাল হয়ে যায়। এবার উদ্ভূত তরল পদার্থটিকে বের করে নাও। এ পদার্থটি সব জিনিসকে দ্রব করে।’
আরবীয় রসায়নে নিশাদল একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে রেখেছে। জীবিত নিশাদল সাধারনত শুষ্ক পাতন প্রণালীতে তৈরি করা হয়। ল্যাটিন ভাষায় প্রকাশিত জাবিরের অনূদিত বই ‘দ্যা ইনভেস্টিগেশনি’ - এ নিশাদর তৈরির বর্ণনা খুঁজে পাওয়া যায়। তাতে তিনি লিখেছেন, ‘পাঁচ ভাগ বা দু’ভাগ মানুষের প্রস্রাব,  এক ভাগ মানুষের ঘাম, এক ভাগ লবণ ও দেড় ভাগ কাঠের ঝুল একসঙ্গে করে এগুলো থেকে কার্যকরী নিশাদল উৎক্ষেপ করে নাও। এই উৎক্ষেপ আবার ঘামে গালিয়ে নিয়ে জমিয়ে নাও পরে আবার সাধারণ লবণ থেকে উৎক্ষেপ করো। তাহলেই ঠিকভাবে প্রস্তুত হবে। অথবা একে সাধারণ লবণের সঙ্গে চূর্ণ করে লম্বা এলুডেলে করে উৎক্ষেপ করো যতক্ষণ না তা সম্পূর্ণ শুদ্ধ অবস্থায় পাওয়া যায়। তারপর যদি সম্ভব হয় তাহলে পানি দিয়ে স্বাভাবিক মুক্ত বায়ুতে একটি পারফিরি পাত্রে গলিয়ে রেখে দাও। অন্যথায় একে ভালোভাবে উৎক্ষেপণ করে শুদ্ধ অবস্থায় রেখে দাও।’

জাবিরের রাসায়নিক মতবাদঃ

জাবির তার ‘কিতাব ইলমেস সানাতিল ইয়াহিয়া ওয়াল হিকমাতিল ফালাসিফিয়াত’ - এ রসায়ন শাস্ত্রের একটি সংজ্ঞা দিয়েছেন। এ সংজ্ঞা অনুযায়ী রসায়ন হলো প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের একটি শাখা। এ শাস্ত্রে দ্রবণীয় বস্তু বা ধাতুগুলোর গঠন প্রণালী খুঁজে বের করা হয় এবং খনিতে কিভাবে আগুনের সাহায্যে ধাতু উৎপন্ন হয় সে ব্যাপারে অনুসন্ধান চালানো হয়। জাবির ‘কিতাব আল-রহমাহ’তে ধাতু নিয়ে আলোচনা করেছেন। বইটিতে তিনি রাসায়নিক বস্তুগুলোকে দু’ভাগে ভাগ করেছেন। এক প্রকারের রাসায়নিক বস্তু হলো ‘জীবিত’ এবং আরেক প্রকারের রাসায়নিক বস্তু হলো ‘মৃত’। রুক্ষ মাটির মতো অপরিষ্কার জিনিসগুলো ছিল তার মতে মৃত। আর যেগুলো উজ্জ্বল ও স্বচ্ছ সেগুলো হলো জীবিত। তার মতে, প্রত্যেক রাসায়নিক বস্তুই অন্যান্য জীব জন্তুর মতো ‘দেহ’ ও ‘আত্মা’র সমন্বয়ে গঠিত। তার একটি হলো দৈহিক আর অন্যটি হলো আধ্যাত্মিক অংশ। রাসায়নবিদের কাজ হলো ‘দেহ’ ও আত্মা’কে ঠিক মতো ভাগ করা এবং যে দেহে যে রকম আত্মা খাপ খায় তাকে সেভাবে সেখানে স্থাপন করা। আত্মকে যথোপযুক্ত দেহে স্থাপন করার মধ্যে দিয়েই রাসায়নিক ধাতুকে রূপান্তরিত করা যায়। জাবিরের মতে, চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছানো নাগাদ জীবনী শক্তিসম্পন্ন জিনিসগুলো হাজার হাজার বছর ধরে মাটির নিচে চাপা পড়ে থাকে এবং এ অবস্থায় তাদের ক্রমবিকাশ ঘটে। ঘাত প্রতিঘাতের মধ্যে দিয়ে তাদের অগ্রসর হতে হয়। এগুলো প্রথমে থাকে একেবারে অশুদ্ধতম অবস্থায়। তারপর ধীরে ধীরে তাদের সংশোধন ঘটে। বহু বছর পর এগুলো স্বর্ণে পরিণত হয়। প্রথমতঃ যেগুলো শুকনো ও ধোঁয়াটে সেগুলো গন্ধকের মতো দ্রব্যে পরিণত হয়। যে জিনিসগুলো ভেজা ও বাষ্পীয় সেগুলো পারদের আকার নেয়। এমনিভাবে তাদের গঠনের কাজ চলতে থাকে। প্রত্যেক বস্তুই এ প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে অগ্রসর হয়। তাদের মধ্যে পারদ ও গন্ধক থাকে। বিজ্ঞানীর কাজ হলো ধাতুর এ রূপান্তকে ত্বরান্বিত করা।
জাবিরের বিভিন্ন বই পুস্তকে পারদ ও গন্ধকের থিওরি খুঁজে পাওয়া যায়। ‘কিতাবুল ইজাহ’তে তিনি বলেছেন, ‘ধাতুগুলো আসলে পারদ ও গন্ধকের সংমিশ্রণ। একটির সঙ্গে অন্যটির পার্থক্য শুধু তাদের অভ্যন্তরীন গুণের পার্থক্য। এদের অভ্যন্তরীণ গুণের পার্থক্যের জন্য গন্ধক দায়ী। আবার স্থান ও সূর্যের তাপের জন্য গন্ধকের গুণের এই পার্থক্য সৃষ্টি হয়। বহু ধরণের গন্ধক রয়েছে। তবে সবচেয়ে ভালো গন্ধক হলো সোনালী রংয়ের। সোনালী রংয়ের গন্ধকের সঙ্গে পারদ যুক্ত হলে  সোনা তৈরি হয়। সোনা আগুনে পোড়ে না। এখানেই সঙ্গে অন্যান্য ধাতুর পার্থক্য।’
‘আল-কুতুব মিয়াত ওয়া এছনা আশার কিতাবান’ - এর প্রথম খণ্ডে পারদ ও গন্ধক তৈরির থিওরি নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। বইটিতে জাবির স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন যে, ৭ টি দ্রবণীয় দ্রব্যের সমন্বয়ে পারদ ও গন্ধক গঠিত। ‘কিতাবুল ইসতিতমাম’ - এ তিনি বলেছেন, সব ধাতুই গন্ধক ও পারদে তৈরি। ‘কিতাবুল খাওয়াস’ - এর দশম পরিচ্ছেদে তিনি বলেছেন, সব খনিজ পদার্থই গন্ধক, পারদ, সোনা ও নিশাদলের সমন্বয়ে গঠিত। তার মতে, ধাতুর মধ্যকার পারদের জন্যই তাকে গলানো, সংকোচন ও প্রসারণ করা সম্ভব হয়। পারদের ওপর ধাতুর ঔজ্জ্বলের তারতম্য নির্ভর করে। যে ধাতুতে পারদের পরিমাণ বেশি সে ধাতু তত বেশি উজ্জ্বল। পারদের আধিক্যের জন্য স্বর্ণ ও রূপাকে উজ্জ্বল দেখায়। গন্ধকের ভিন্ন মাত্রার জন্য স্বর্ণ ও রূপার বর্ণ ভিন্ন হয়। স্বর্ণে রয়েছে হলদে গন্ধক। তাই তার রং হলদে। অন্যদিকে শ্বেত গন্ধক থাকায় রৌপ্যকে শ্বেত বর্ণের মনে হয়। পারদ সহজে অন্য ধাতুর সঙ্গে মিশে যায়। মিশে যাবার ক্ষমতাই ‘পারদ’ নামে পরিচিত। জাবির মনে করতেন, পুড়ে যাবার মানে হলো রাসায়নিক বস্তু থেকে গন্ধক জাতীয় জিনিসের অপসারণ। অপরিষ্কার ধাতুগুলোকে পুড়িয়ে পরিষ্কার করার সময় যে ধোঁয়া তৈরি হয় সেই ধোঁয়াই গন্ধক জাতীয় জিনিস। জাবিরের মতে, গন্ধক এক জাতীয় তৈলাক্ত পদার্থ।
‘উসকূকাসিল আস’ - এ রসায়নে ব্যবহৃত জিনিসগুলো কিভাবে শ্রেণীভুক্ত করা যায় তিনি তার একটি বিবরণ দিয়েছেন। তাতে তিনি বলেছেন, ‘যারা আহজার (পাথর) ব্যবহার করার পক্ষপাতী তাদের মতে, রসায়নের জ্ঞান আহজারের মধ্যেই নিহিত। জীবিত বা উদ্ভিদ জাতীয় জিনিস সম্পর্কে জ্ঞান বা ব্যবহারের মধ্যে নয়। তারা বলেন, রসায়নবিদরা আহজারের বর্ণনা দেয়ার সময় ধাতব পদার্থগুলোর প্রতি লক্ষ রাখেন। অন্য কিছুর প্রতি খেয়াল রাখেন না। এ ধাতব পদার্থগুলো হলো গন্ধক, জারানিখ (আর্সেনিক সালফাইড), পারদ ও আজসাদ (বস্তু)। রসায়নবিদগণ ধাতব পদার্থগুলোকে চারটি শ্রেণীতে ভাগ করেছেন। এগুলো হলো রুহ (আরওয়াহ), জিসম (আজসাম), নফস (নূফুস) ও জসদ (আজসাদ)। রসায়নবিদগণ পদার্থগুলোর ভেতরকার পার্থক্যও বর্ণনা করেছেন। যেসব জিনিস আগুনের তাবে উবে যায় সেগুলো হলো আরওয়াহ। ৬ টি গন্ধক, জারনিখ, নিশাদল (সালএমোনিয়াক), কর্পূর, তৈল ও পারদের মধ্যে তিনটি বস্তু আগুনে পোড়ে এবং যেসব জিনিস তাদের সংস্পর্শে আসে তাদেরকেও তারা  পোড়ায়। এই তিনটি পদার্থ হলো গন্ধক, জারনিখ ও তৈল। অন্য তিনটি জিনিস আগুনের তাবে উবে যায়। এ জিনিসগুলো নিজেরাও পোড়ে না এবং অন্য জিনিসকেও পোড়াতে সহায়তা করে না। এগুলো হলো নিশাদল, পারদ ও কর্পূর। রসায়নবিদরা রুহ (স্পিরিট) শব্দটি যেভাবে ব্যবহার করেছেন তাতে মনে হয় তার অর্থ হলো কার্যকরী টিংচার। কেননা জিসমের ভেতর বেশ পরিমাণ রূহ অবস্থান করে। এ প্রসঙ্গে বলা হয়, আমাদের জিনিসগুলোতে জিসমের (জড় পদার্থ) অংশ কম এবং আত্মার অংশ বেশি। এজন্য আহজারের সামান্য অংশ অনেকখানি অজৈব পদার্থকে রঞ্জিত করতে পারে।’

ল্যাভুয়াশিয়েঁর গোচরে ধাতুর গঠন সম্পর্কে জাবিরের মতবাদঃ

ধাতুর গঠন সম্পর্কে জাবিরের মতবাদ ফরাসি বিজ্ঞানী এন্টোয়িন ল্যাভুয়াশিয়েঁর গোচরীভূত হয়েছিল। তবে সরাসরি জাবিরের মতবাদ হিসেবে নয়। ১৬৬৭ সালে জার্মান পদার্থ বিজ্ঞানী জোহান জোয়াসিম বেচার ‘ফোজিস্টন’ নামে একটি তত্ত্ব পুনরুজ্জীবিত করেন। জাবির এ মতবাদ প্রচার করেছিলেন। ফোজিস্টন হলো এমন একটি ধাতু যার বর্ণ, স্বাদ ও গন্ধ নেই। তাকে একটি মৌলিক ধাতু হিসেবে গণ্য করা হয়। জাবিরের  যুগে বিশ্বাস করা হতো যে, ভূগর্ভ থেকে দু’টি নির্গমনের মধ্য দিয়ে পাথর ও ধাতু গঠিত হয়েছে। জাবির ধাতু গঠনের এ তত্ত্ব মেনে নেন। তবে মনে হয় তিনি এ তত্ত্বকে অপর্যাপ্ত হিসাবে ধারণা করেছিলেন। তাই তিনি অস্পষ্টতা দূর করতে এ তত্ত্ব সংশোধন করেন। পর্যবেক্ষণ থেকে জাবির এ সিদ্ধান্তে পৌঁছান যে, যেসব পদার্থের সমন্বয়ে পারদ ও গন্ধক গঠিত সেগুলো সুপরিচিত পদার্থ নয়। বরং এগুলো হচ্ছে কাল্পনিক। তিনি বিশ্বাস করতেন, ভূগর্ভস্থ দুটি নির্গমনে তাৎক্ষণিকভাবে খনিজ পদার্থ অথবা ধাতু গঠিত হয়নি। তাকে মধ্যবর্তী একটি রূপান্তরের মধ্য দিয়ে অগ্রসর হতে হয়েছে। ভূগর্ভ থেকে প্রথম নির্গমনে শুষ্ক অথবা ধোঁয়াটে বস্তু গন্ধক ও পারদের সমন্বয়ে ধাতু গঠিত হয়েছে। জাবিরের এ মতবাদ স্থায়ী হয়। অষ্টাদশ শতাব্দীতে তার মতবাদ আরো সংশোধন ও পরিবর্তন করা হয়। তার এ সংশোধিত মতবাদই ফরাসি বিজ্ঞানী ল্যাভুয়াশিয়েঁর কাছে পৌঁছেছিল। এ ব্যাপারে ই.জে. হোমইয়ার্ড তার ‘দ্যা ওয়ার্কস অব জাবির’ শিরোনামের গ্রন্থের ভূমিকায় লিখেছেন, ‘That this theorly has all the bad qualities which Vavoisier found in the theory of pholgiston several hundred years later can not be denied, but it represented a distinct advance upon any theory which had preceeded it and satisfied the interllectual curiosity of many brilliant scientist for a very lengthy period. The Phlogiston theory itself has been described as the lamp and guide of chemists during the eighteenth century and the time-honoured and highest generalistion of physical chemistry for over half a century, was a direct descendent of Gabir's theory of the constitution of metals.'
অর্থাৎ ‘সব মন্দ গুণ সত্ত্বেও কয়েক শতাব্দী পরে ল্যাভুয়াশিঁয়ে ফোজিস্টন তত্ত্বে এ মতবাদ দেখতে পেয়েছিলেন। এ সত্য অস্বীকার কার যাবে না। তবে এ মতবাদ ছিল তার আগের যে কোন তত্ত্বের চেয়ে একটি সুনির্দিষ্ট অগ্রগতি। এ মতবাদ একটি দীর্ঘ সময় পর্যন্ত বহু মেধাবী বিজ্ঞানীর বুদ্ধিবৃত্তিক কৌতুহল নিবৃত করেছে। অষ্টাদশ শতাব্দীতে ফোজিস্টন তত্ত্বকে রসায়নের একটি আলোকবর্তিকা ও চালিকা হিসাবে আখ্যায়িত করা হতো এবং অর্ধ শতাব্দীব্যাপী তা ছিল পদার্থবিদ্যা বিষয়ক রসায়নে সবচেয়ে সময়োচিত ও সর্বোচ্চ প্রয়োগযোগ্য। এ তত্ত্ব ছিল ধাতু গঠনে জাবিরের মতবাদের সরাসরি পরবর্তী মতবাদ।’

জাবিরের গুরু ইমাম জাফরের মতবাদঃ

জাবিরের যুগে এরিস্টেটালের পদার্থ বিজ্ঞান নয়া প্লেটোবাদ হিসাবে আত্মপ্রকাশ করে। এরিস্টেটালের মতবাদে প্রতিটি মৌলিক পদার্থের গঠনে কতগুলো অভিন্ন গুণের কথা উল্লেখ করা হতো। জাবিরের ‍গুরু ইমাম জাফর সাদিক এরিস্টোটালের চারটি মৌলিক উপাদানের তত্ত্ব খণ্ডন করে আবিষ্কার করেন যে, প্রতিটি মৌলিক উপাদান বিভিন্ন রাসায়নিক উপাদান নিয়ে গঠিত। তিনি মন্তব্য করেন, ‘আমি ভেবে বিস্মিত হই যে, এরিস্টোটলের মতো কোন ব্যক্তি কিভাবে বলতে পারেন যে, পৃথিবীতে কেবলমাত্র মাটি, পানি, বাতাস ও আগুন - এ চারটি উপাদান থাকতে পারে? মাটি কোন উপাদান নয়। বহু উপাদানের সমন্বয়ে মাটি গঠিত। প্রতিটি ধাতু  এক একটি উপাদান। মাটিতে এমন বহু উপাদানের অস্তিত্ব বিদ্যমান।’
ইমাম জাফর সাদিক একটি অণু তত্ত্ব উদ্ভাবন করেন। তিনি তার অণু তত্ত্বে বলেন, ‘একটি ক্ষুদ্র বস্তু কণা থেকে বিশ্ব ব্রক্ষাণ্ডের সৃষ্টি হয়েছে। তাতে ছিল দু’টি বিপরীত মেরু। ঐ বস্তু কণা একটি অতি ক্ষুদ্র কণা বা এটম তৈরি করে। এভাবে পদার্থ অস্তিত্ব লাভ করে। তারপর পদার্থ বিভক্ত হয়ে যায়। এটমের দুষ্প্রাপ্যতা অথবা ঘনত্বে এ বিভক্তি ঘটে।’
জাফর সাদিক পদার্থের জড়তা ও স্বচ্ছতার ওপর আরেকটি তত্ত্ব প্রকাশ করেন। তিনি তার এ তত্ত্বে বলেন, যেসব বস্তু কঠিন ও শোষণক্ষম সেগুলো অস্বচ্ছ এবং যেসব পদার্থ কঠিন ও আকর্ষহীন সেগুলো কম বা বেশি স্বচ্ছ। তিনি আরো উল্লেখ করেন, অস্বচ্ছ পদার্থ তাপ শোষণ করে।

মৌলিক উপাদান সম্পর্কে জাবিরের ধারণাঃ

জাবির উত্তাপ, শীতলতা, শুষ্কতা ও আদ্রতা - এ চারটি মৌলিক গুণের ভিত্তিতে এরিস্টোটলের উল্লেখিত প্রতিটি উপাদান বিশ্লেষণ করেন। তার মতে, প্রতিটি ধাতুতে দু’টি গুণ অভ্যন্তরীণ এবং অন্য দু’টি গুণ বাহ্যিক। উধাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, সীসা অভ্যন্তরীণভাবে ঠান্ডা ও শুষ্ক। অন্যদিকে স্বর্ণ উত্তপ্ত ও আর্দ্র। জাবির বিশ্লেষণ করে বলেন যে, কোনো ধাতুর গুণাবলী পরিবর্তন করা হলে একটি ভিন্ন ধাতুর জন্ম হবে। তিনি ভিন্ন পদ্ধতিতে তার তত্ত্ব প্রমাণ করেন। তিনি মনে করতেন, মৌলিক বা প্রাকৃতিক গুণাবলী চারটি। সেগুলো হলোঃ তাপ, শুষ্কতা, শীতলতা ও আদ্রতা। এ চারটি উপাদান বস্তুর সঙ্গে একত্রিত হলে প্রথম মানের মিশ্রণ তৈরি হবে।
উপাদানগুলো তিনটি একত্রিত হলে তৈরি হবেঃ
     উষ্ণতা+শুষ্কতা+বস্তু = আগুন
     উষ্ণতা+আদ্রতা+বস্তু = বাতাস
     ঠান্ডা+আদ্রতা+বস্তু = পানি
     ঠান্ডা+শুষ্কতা+বস্তু = মাটি

জাবিরের বইয়ের পরিচয় নিয়ে বিভ্রাট সৃষ্টিঃ

জাবিরের জন্ম তারিখ নিয়ে গোলমাল দেখা দেয়ায় ল্যাটিন ভাষায় তার অনূদিত বইগুলোর পরিচয় নিয়ে বিভ্রাট ঘটে। সন্দেহবাদীদের একদলে রয়েছেন জার্মান পণ্ডিত জে.রুসকা ও পল ক্লাউস। অন্য দলে রয়েছেন ইংরেজ পণ্ডিত ই.জে. হোমইয়ার্ড ও গণিতের ঐতিহাসিক জি. সারটন। উভয়দলই জাবিরকে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ রসায়নবিদ হিসাবে স্বীকৃতি দিচ্ছেন এবং তিনি রসায়ন শাস্ত্রর ওপর প্রচুর বই লিখেছেন বলে স্বীকার করছেন। প্রথম দলের মতে, জাবির অষ্টম শতাব্দীর লোক নন। আর যদি অষ্টম শতাব্দীর লোক হয়েও থাকেন তাহলেও তার নামে যেসব বই পুস্তক দেখা যায় সেগুলোর সব তার লিখা নয়। দ্বিতীয় দলের মতে, জাবির অষ্টম শতাব্দীর লোক। গ্রন্থগুলো তার নিজের এবং প্রকৃতপক্ষে তিনি আধুনিক রসায়নের জন্মদাতা।
জাবিরের জন্ম তারিখ নিয়ে বিভ্রাট ছাড়া আরো দু’টি কারণে এ মতবিরোধ দেখা দিয়েছে। একটি কারণ হলো মুসলিম পণ্ডিত ইবনে নাদিমের অভিমত এবং দ্বিতীয় কারণটি হলো ত্রয়োদশ ও চতুর্দশ শতাব্দীতে ল্যাটিন ভাষায় প্রকাশিত ৫ টি বইয়ের মূল আরবী কপির অপ্রাপ্যতা। এ ৫ টি বই হলোঃ
     (১) লাইবার (জিবারি) দ্যা ট্রান্সমিউটেশনি মেটালোরাম
     (২) দ্যা ইনভেস্টিগেশনি পারফেকশনিস
     (৩) দ্যা ইনভেনশনি ভেরিটাটিস
     (৪) লাইবার ফোরনাকাম
     (৫) টেসরামেন্টাম জিবারি
ত্রয়োদশ শতাব্দীর আগে আলোচিত বইগুলো সম্পর্কে কেউ কোন উল্লেখ করেননি। ইবেন খাল্লিকান ও হাজী খলিফাও মূল আরবী গ্রন্থের কোনো উল্লেখ করেননি। এখান থেকে বইগুেলোর পরিচয় নিয়ে সন্দেহ দানা বাঁধে। উনবিংশ শতাব্দীর অন্যতম বিজ্ঞানী হেরম্যান কোপ প্রথম সন্দেহ ঢোকান। তিনি জার্মান রসায়নবিদ গুস্তাভ বাইলের সহায়তায় কথিত ‘জিবার’ ও জাবির ইবনে হাইয়ানের জ্ঞাত সব তথ্য সংগ্রহ করেন। হেরম্যান কোপ এবং গুস্তাভ বাইল উভয়ে ছিলেন আরবী ভাষায় অনভিজ্ঞ। ল্যাটিন ভাষায় প্রকাশিত অনুবাদের ওপর ভিত্তি করে তারা এ সিদ্ধান্তে পৌঁছান যে, জিবারে নামে প্রচলিত সবগুলো বই জাবিরের কিনা তা নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়। তারা ধারণা করেছিলেন যে, ‘জিবার’ ল্যাটিন এবং জাবির আরব। তাদের এ ধরণা মোটেও সাঠিক ছিল না। মঁসিয়ে বার্থেলট তার ‘লা চিমাই আউ মোয়েন এজ. - এ উল্লেখিত পণ্ডিতদের সন্দেহের প্রতি সায় দেন। বার্থেলট জাবিরের ৯ টি বই সম্পাদনা করে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হন যে, ল্যাটিন ভাষায় অনুদিত গ্রন্থগুলো জাবিরের নয়।
জাবিরের প্রতি বার্থেলট এ অবিচারের প্রতিবাদে গণিতজ্ঞ ই. জে. হোমইয়ার্ড ‘এ ক্রিটিক্যাল এক্সামিনেশন অব বার্থেলট ওয়ার্কস আপন এরাবিক কেমিস্ট্রি’ শিরোনামে এক গবেষণাধর্মী লেখায় বলেছেন, ‘Fortunately for chemistry, this man of genius nad unbounded energy was drawn towards natural sciences and encouraged by Imam Jafar al-Sadiq turned his attention to the study of the composition of substances obtained from minerals, plants and animals. His writings prove that this study meant to him not merely the reading of books but the close investigation of Nature and a stem discipline in the laboratory. It has to be said that Berthelot, having made up his mind-on what seem to be insufficient grounds-that the Latin Jaber is not to be indetified with the Arab Jaibr Ibn Hayyan, appears deliberately to underrate the latter; he cartainly gives an entirely false idea of Jabir's scientific ability.’
অর্থাৎ রসায়নের জন্য সৌভাগ্য যে, এই মেধাবী ও অফুরন্ত প্রাণশক্তির অধিকারী লোকটি প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিলেন এবং ইমাম জাফর আল-সাদিকের উৎসাহে খনিজ, উদ্ভদ ও প্রাণী থেকে প্রাপ্ত উপাদানগুলোর গঠন অধ্যয়নে তার মনোযোগ নিবিষ্ট করেছিলেন। তার লেখালিখি থেকে প্রমাণিত হচ্ছে যে, নিছক বই পাঠ করা তার অধ্যায়নের লক্ষ্য ছিল না বরং প্রকৃতির নিবিড় অনুসন্ধান এবং গবেষণাগারে কঠোর গবেষনা করাই ছিল তার উদ্দেশ্য। উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, বার্থেলট দৃশ্যত অপর্যাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে বলেছেন, ল্যাটিন জিবারকে আরবি জাবির ইবেন হাইয়ানের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলা ঠিক নয়। তাতে মনে হচ্ছে, তিনি উদ্দেশ্যমুলকভাবে তাকে খাটো করেছেন। তিনি জাবির ইবনে হাইয়ানের বৈজ্ঞানিক সামর্থ সম্পর্কে পুরোপুরি ভুল ধারণা দিচ্ছেন।’

১৯২২ সালে পণ্ডিত ডার্মাসটীডটার্স জিবারের নামে প্রচলিত ল্যাটিন গ্রন্থগুলো অনুবাদ করেন। তবে তিনি জিবার সম্পর্কে অথবা কোন কোন বই অবলম্বনে ল্যাটিন ভাষায় বইগুলো প্রকাশিত হয়েছিল সে ব্যাপারে কোন সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেননি। জে. রুসকাও এ ৫ টি বইয়ের লেখক সম্পর্কে ভূল ধারণা দিয়েছেন। তিনি বলেন, ল্যাটিন ভাষায় প্রকাশিত বইগুলো জাবির ইবনে হাইয়ানের নয়। সম্ভবত পশ্চাত্যের কোন পণ্ডিত বইগুলো রচনা করেছেন। অনুরূপ মন্তব্য করেও তিনি নিজের নামের পরিবর্তে জাবিরের ল্যাটিন নাম  জিবারের নামে বইগুলো চালিয়ে দেন। কথিত ল্যাটিন ‘জিবার’ ও জাবির ইবনে হাইয়ান যে আসলে একই ব্যক্তি ‘দ্যা ওয়ার্কস অব জিবার’ শিরোনামে গ্রন্থে গণিতজ্ঞ হোমইয়ার্ড তা অকপটে স্বীকার করেছেন। বইটির ১৭ নম্বর পৃষ্ঠায় তিনি লিখেছেন, ‘It is ceratin that Geber is none other than the greatest chemist of Islam, Gabir Ibn Hayyan and that some of Gabri's books were translated into Latin in the Middle Ages.’ অর্থাৎ ‘একথা নিশ্চিত যে, জিবার ইসলামের শ্রেষ্ঠতম রসায়নবিদ জাবির ইবনে হাইয়ান ছাড়া আর কেউ নন এবং মধ্যযুগে জাবিরের কয়েকটি বই ল্যাটিন ভাষায় অনুবাদ করা হয়।’

জাবিরকে রসায়নের জনক হিসেবে স্বীকৃতিঃ

কেউ কেউ ফরাসি বিজ্ঞানী এন্টোয়িন লরা ল্যাভুয়াশিয়েঁকে আধুনিক রসায়নের জনক হিসাবে আখ্যা দিচ্ছেন। কিন্তু তা মোটেই ঠিক নয়। মুসলিম বিজ্ঞানীগণ বিশেষ করে জাবির ইবনে হাইয়ান হলেন আধুনিক রসায়নের জনক। বিজ্ঞান লেখক ও ঐতিহাসিকগণ জাবিরকে এ শাস্ত্রের জনক হিসাবে অকপটে স্বীকৃতি দিচ্ছেন। ঐতিহাসিকদের অভিমতগুলো একে একে উল্লেখ করলেই রসায়নে জাবির ও মুসলিম বিজ্ঞানীদের অবস্থান স্পষ্ট হয়ে উঠবে।
প্রথমে ইংরেজ দার্শনিক ব্যাকনের একটি উক্তি উদ্ধৃত করা হলো। তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন, ‘Jabir Ibn Hayyan is the first to teach the science chemistry to the world, he is the father of chemistry.’ অর্থাৎ ‘জাবির ইবনে হাইয়ান বিশ্বকে প্রথম রসায়ন বিজ্ঞান শিক্ষ দিয়েছিলেন এবং তিনি হলেন রসায়নের জনক।’
এবার ‘ওয়ার এন্ড দ্যা কালচার‌্যাল হেরিটেজ অব ইরাক’ - এর লেখক জন ওয়ারেন এবং ‘অন ওয়াইন, চারালিটি এন্ড ক্রিস্টালোগ্রফি’র লেখক ডেরিওয়েন্ডারের অভিমত উল্লেখ করা হলো। এ দু’জন লেখকের উদ্ধৃতি দিয়ে উইকিপিডিয়া: দ্যা ফ্রি এনসাইক্লোপিডিয়া’য় ‘হিস্টরি অব কেমিস্ট্রি’ শিরোনামে একটি রচনায় বলা হয়, ‘The development of the morden scientific method was slow and arduous, but an early scientific method for chemistry began emerging among early muslim chemists, beginning with the 9th century chemist Jabir Ibn Hayyan, who is considered as the father of chemistry. He intorduced a systematic and experimental approach to scientific research based in the laboratory in contrast to the ancient Greek and Egyptian alchemists whose works were largely allegorical and often unintelligible. He also invented the named the alembic (al-anbiq), chemically analyzed many chemical substances, composed lapidaries, distinguish between alkalis and acids and manufactured hundreds of drugs. He also refined the theory of five classical elements into the theory of seven alchemical elements after indentifying mercury and sulphur as chemical elements.’
অর্থাৎ ‘আধুনিক বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির উন্নয়ন ছিল ধীর এবং দুঃসাধ্য। তবে প্রাথমিক যুগের মুসলিম রসায়নবিদদের মধ্যে প্রাথমিকভাবে রসায়নে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির সূচনা হয়। নবম শতাব্দীর রসায়নবিদ জাবির ইবনে হাইয়ানের অবির্ভাবের মধ্য দিয়ে রসায়নের এ অগ্রগতি ঘটে। জাবিরকে রসায়নের জনক হিসেবে গণ্য করা হয়। তিনি প্রাচীন গ্রীক ও মিসরীয় অপরসায়নবিদের বিপরীতে গবেষণাগারভিত্তিক বৈজ্ঞানিক গবেষণায় ধারাবাহিক ও পরীক্ষামূলক পদ্ধতি চালু করেন। গ্রীক ও মিসরীয় অপরসায়নবিদদের কর্ম ছিল মূলত রূপক এবং কখনো কখনো দূর্বোধ্য। তিনি চোলাইযন্ত্র (আল-আনবিক) আবিষ্কার এবং এ যন্ত্রের নামকরণ করেছেন, বহু রসায়নিক উপাদান রাসায়নিকভাবে বিশ্লেষণ করেছেন, রত্নপাথর তৈরি করেছেন, ক্ষার ও অম্লের মধ্যে পার্থক্য নিরূপণ করেছেন এবং শত শত ওষুধ তৈরি করেছেন। তিনি পারদ ও সালফারকে রাসায়নিক উপাদান হিসাবে চিহ্নিত করেছেন। তারপর তিনি ৫ টি ক্লাসিক্যাল উপাদানের তত্ত্বকে ৭ টি আলকেমিক্যাল উপাদানের তত্ত্বে রূপান্তরিত করেছেন এবং এভাবে তিনি এ তত্ত্বকে সংশোধনও করেছেন।’
দর্শন ও যুক্তিবিদ্যার গ্রীক পণ্ডিত এরিস্টোটলের অবদান যতটুকু, আজকের রসায়নে জাবির ইবনে হাইয়ানের অবদানও ঠিক ততটুকু। জাবিরকে এরিস্টোটলের সঙ্গে তুলনা করে ফরাসি পণ্ডিত মঁসিয়ে বার্থেলট লিখেছেন, ‘That Jabir is the chemistry of what aristotle in logic.’ অর্থাৎ ‘যুক্তিবিদ্যায় এরিস্টোটাল যা রসায়নে জাবির হলেন তাই।’ রসায়ন বিজ্ঞানে জাবিরের অবদান মূল্যায়ন করতে গিয়ে ম্যাক্স মায়ারহোফ মন্তব্য করেছেন, ‘ইউরোপে আলকেমি ও কেমিস্ট্রির পুরো ইতিহাসে তার প্রভাব খুঁজে পাওয়া যাবে।’
এরিক জন হোমইয়ার্ড তার ‘আলকেমি’ শিরোনামের গ্রন্থের ১৯ পৃষ্ঠায় মুসলিম বিজ্ঞানীদের রসায়নের প্রাণপুরুষ হিসাবে স্বীকৃতি দিয়ে লিখেছেন, ‘The word alchemy and its modern formation, chemistry came directly from the Arabic and provide reminders that in the early Middle Ages the principal students of the Art-were Muslims.’ অর্থাৎ ‘শব্দগতভাবে আলকেমি এবং আলকেমির আধুনিক রূপ রসায়ন সরাসরি এসেছে আরবী থেকে এবং স্বারক হিসাবে রসায়ন প্রমাণ করেছে যে, মধ্যযুগের সূচনাকালে মুসলমানরা ছিল এ বিদ্যার মূল অধ্যায়নকারী।’
রসায়নে আরব মুসলিম বিজ্ঞানীদের অবিস্বরণীয় অবদান তুলে ধরতে গিয়ে উইল ডুরান্ট ‘দ্যা স্টোরি অব সিভিলাইজেশ ফোর: দি এজ অব ফেইথ’ - এ লিখেছেন, ‘Chemistry as a science was almost creaded by the Muslims; for in this field, where the Greeks (so far as we know) were confined to industrial experience and vague hypothesis, the Saracens introduced precise observation, controlled experiment and careful records. They invented and named the alembic (al-abniq), chemically analyzed innumerable substances, composed lapodaries, distinguished alkalis and acid, investigated their affinities, studied and manufactured hundreds of drugs. Alchemy, which the Muslims inherited from Egypt, contributed to chemistry by a thousand incidental discoveries and by its mentod, which was the most scientific of all medieval operations.’
অর্থাৎ‘বিজ্ঞান হিসাবে রসায়ন হলো মুসলমানদের সৃষ্টি। কেননা, যেখানে এ ক্ষেত্রে গ্রীকরা ছিল (এ পর্যন্ত আমরা যতদূর জানি) শিল্প ও অস্পষ্ট ধারণার মধ্যে সীমাবদ্ধ সেখানে মুসলমানার নির্ভুল পর্যবেক্ষণ, নিয়ন্ত্রিত পরীক্ষা নিরীক্ষা এবং সযত্ন রেকর্ড সংরক্ষণ করেছে। তারা এলেমবিক (আল-আনবিক) আবিষ্কার এবং তার নামকরণ করেছে, রাসায়নিকভাবে অসংখ্য উপাদান বিশ্লেষণ করেছে, মূল্যবান পাথর কাটার যন্ত্র তৈরি করেছে, আলকালি ও এসিডকে পৃথক করেছে এবং এ দু’টির সাদৃশ্য অনুসদ্ধান করেছে, শত শত ওষুধ পরীক্ষা ও উৎপাদন করেছে। মিসর থেকে মুসলমানরা উত্তরাধিকারসূত্রে আলকেমি লাভ করে। ঘটনাক্রমে আলকেমি শত শত আবিষ্কারের মধ্য দিয়ে রসায়নে অবদান রেখেছে। আলকেমির পদ্ধতি ছিল মধ্যযুগের সকল ক্রিয়াকলাপের মধ্যে সবচেয়ে বৈজ্ঞানিক।’
বিজ্ঞানের ইতিহাসের জনক জর্জ সারটন ‘ইন্ট্রাডাকশন টু দ্যা হিস্টরি অব সায়েন্স’ - এ লিখেছেন, ‘We find in his (Jabir) writings remarkably sound views on methods of chemical research, a theory on the geologi8c formation of metals (the six metals differ essentially because of different proportions of sulphur and mercury in them); preparation of various substances (e.g. basic lead carbonatic, arsenic and antimony from their sulphides).’
অর্থা’ ‘আমরা তার (জাবির) লেখালিখিতে রাসায়নিক গবেষণার পদ্ধতি সম্পর্কে তাৎপর্যপূর্ণ দৃঢ় অভিমত, ধাতুর (সালফার ও পারদের অনুপাত ভিন্ন ভিন্ন হওয়ায় ৬ টি ধাতু একে অন্য থেকে পৃথক) ভৌত গঠনের তত্ত্ব, বিভিন্ন উপাদানের প্রস্তুত (যেমন-সালফাইড থেকে মৌলিক সীসা কার্বন, আর্সেনিক ও এন্টিমনি) প্রণালী খুঁজে পাই।’
রসায়নে মুসলমানদের মৌলিক অবদানের স্বীকৃতি হিসাবে সর্বশেষ উল্লেখ করা হলো ড. রগহেব ইলসারগনির একটি অভিমত। ইসলাম স্টোরি ওয়েবসাইটে প্রকাশিত ‘মুসলিমস এন্ড দি ইনভেনশন অব কেমিস্ট্রি’ শিরোনামে একটি নিবন্ধে ড. ইলসারগনি লিখেছেন, ‘Chemistry is considered an Islamic Science by all menas, as the world chemistry had not even been invented in any language or civilization before the Islamic civilization; neither the ancient Egyptian onr the Greek civilization. In European languages, the word ''Chemistry'' is written as ''Alchemaie''. It is a well-known fact that every Latin word that starts with ''Al'' has an Arabic origin. An example of that would be ''alcohol'' and ''algebra''.....etc.’
অর্থাৎ ‘যে কোন বিচারে রসায়নকে একটি ইসলামী বিজ্ঞান হিসাবে বিবেচনা করা হয়। কেননা ইসলামী সভ্যতার আবির্ভাবের আগে রসায়ন শব্দটি কোন ভাষা অথবা সভ্যতায় খুঁজে পাওয়া যায় না।  এমনকি প্রাচীন মিসরীয় ও গ্রীক সভ্যতায়ও নয়। ইউরোপীয় ভাষায় ‘কেমিস্ট্রি’ শব্দটি লিখা হয় ‘আলকিমিয়া’ হিসাবে। একথা সর্বজনবিদিত সত্য যে, ‘আল’ দিয়ে যেসব ল্যাটিন শব্দ লিখা শুরু হয় তাদের প্রত্যেকটির উৎপত্তি আরবীতে। তার উধাহরণ হলো ‘আলকেমি’, ‘এলজাব্রা’ ইত্যাদি।’

জাবিরের রচনাবলীঃ

জাবির তিন হাজারের মতো গ্রন্থ রচনা করেন। তিনি বিভিন্ন বিষয় নিয়ে পরীক্ষা নিরীক্ষা করে যা পেয়েছিলেন সেগুলোর ফলাফলই ছিল তার গ্রন্থের বিষয়বস্তু। তার প্রণীত গ্রন্থাবলীর মধ্যে রসায়নে ২৬৭ টি, যুদ্ধাস্ত্র বিষয়ক ৩০০ টি, চিকিৎসা বিজ্ঞান বিষয়ক ৫০০ টি, দর্শনে ৩০০ টি, জ্যেতির্বিজ্ঞান বিষয়ক ৩০০ টি, দার্শনিক যু্ক্তি খণ্ডন করে লেখা আরো পাঁচ শত বই উল্লেখযোগ্য। তার গ্রন্থের সংখ্য অধিক হলেও কোনো কোনটির পৃষ্ঠা সংখ্যা দুই কিংবা চারের বেশি নয়। তা ‘দ্যা ওয়ান হান্ড্রেড টুয়েলভ বুক’ নামে পরিচিত একটি সংগ্রহ খলিফা হারুনুর রশীদের বারমাকী মন্ত্রীকে উৎসর্গ করা হয়েছিল। ‘এমার‌্যাল্ড টেবলেট’ -এর আরবী ভাষ্য হলো এ সংগ্রহের একটি অংশ। বইটিতে অপরসায়নের পুনঃপুন পরীক্ষা এবং উৎসের বর্ণনা দেয়া হয়েছে। মধ্যযুগে ল্যাটিন ভাষায় বইটি প্রকাশিত হলে সাড়া পড়ে যায়। বইটি পাঠ করে ইউরোপীয় অপসায়নবিদরা বিস্মিত হয়েছিলেন। জাবিরের ‘কিতাব আল-সবিন’ এর ইংরেজি শিরোনাম ‘দ্যা বুক অব সেভেনটি’। বইটিতে ৭০ টি প্রবন্ধ। ৩১ থেকে ৭০ পর্যন্ত প্রবন্ধগুলোয় খনিজ পদার্থ এবং প্রথম ৩০ টি প্রবন্ধে প্রানী ও শাক সবজি নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। ‘কিতাব আল-জহর’ (Book of Venus) এবং ‘কিতাব আল-আহজার’ (Book of Stone) শিরোনামের দু’টি বইও উল্লেখযোগ্য। ‘দ্যা টেন বুক অন র‌্যাটিফিকেশন’ ‘(The Ten Book on Ratification) -  এ পিথাগোরাস, সক্রেটিস, প্লেটো ও এরিস্টোটালের মতো আলকেমিস্টদের বিবরণ স্থান পেয়েছে। ‘দ্যা বুক অব ব্যালেন্স’ (The Book of Balance)  নামে পরিচিত বইটিতে রয়েছে জাবিরের বিখ্যাত ‘থিওরি অব দ্যা ব্যালেন্স ইন ন্যাচার’ (Theory of the Balance in Nature)।
আলকেমির ওপর জাবিরের লেখা বইগুলো ল্যাটিন ভাষায় অনুবাদ করা হয় এবং বইগুলো ইউরোপীয় আলকেমিস্টদের কাছে মানসম্মত বই হিসাবে স্বীকৃতি লাভ করে। ১১৪৪ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি চেস্টারের রবার্ট ‘বুক অব দ্যা কম্পোজিশন অব আলকেমি’ শিরোনামে জাবিরের ‘কিতাব আল-কিমিয়া’ ইংরেজিতে অনুবাদ করেন। জাবিরের এ বইটি অনুবাদের মধ্য দিয়ে ইউরোপে আলকেমির যাত্রা শুরু হয়। উমাইয়া যুবরাজ খালিদ ইবনে ইয়াজিদ এবং একজন সন্ন্যাসির মধ্যকার সংলাপ হলো ‘কিতাব আল-কিমিয়া’র বিষয়বস্তু। ‘বুক অব দ্যা কম্পোজিশন অব আলকেমি’র ভূমিকায় রবার্ট লিখেছেন, ‘বইটির অনুবাদ করার সময় ল্যাটিন ইউরোপ ছিল আলকেমি সম্পর্কে অজ্ঞ।’ ১১৮৭ সালে ক্রিমোনার গেরার্ড ‘লাইবার সেপটুয়াজিনতা’ শিরোনামে জাবিরের ‘কিতাব আল-সাবিন’ ল্যাটিন ভাষায় অনুবাদ করেন। মঁসিয়ে বার্থেলট ‘বুক অব দ্যা কিংডোম’, ‘লিটল বুক অব দ্যা ব্যালেন্সেস’, ‘বুক অব মারকিউরি এন্ড কনসেন্ট্রেশন’ এবং ‘বুক অব দি ইস্টার্ন মারকিউরি’ প্রভৃতি শিরোনামে তার কয়েকটি বই অনুবাদ করেন। জাবিরের উল্লেখযোগ্য বইগুলো হলোঃ
   (১) কিতাবু উসতু কাসিল উসিল আউয়াল ইলাম বারামিকা
   (২) কিতাবু উসতু কাসিল আসিস ছানি ইলাইহিম
   (৩) কিতাবুল কামালে হুয়াহু সালেছ ইলাইহিম
   (৪) কিতাবুল ওয়াহিদুল কাবির
   (৫) কিতাবুল ওয়াহিদিস সাগির
   (৬) কিতাবুল রুকোনে
   (৭) কিতাবুল বাইয়ান
   (৮) কিতাবুল তারতীব
   (৯) কিতাবুল নূর
   (১০) কিতাবুস সিবগিল আহমার
   (১১) কিতাবুল খামাইরিস কাবির
   (১২) কিতাবুল তাদবিরুর রাইয়া
   (১৩) কিতাব ইউরাফু বিস ছালিস
   (১৪) কিতাবুর রুহ
   (১৫) কিতাবুয যিবাক

মৃত্যুঃ

বিশ্ববিখ্যাত এ মনীষীর মৃত্যুর তারিখ নিয়ে মতভেদ রয়েছে। কোনো কোনো সূত্রে বলা হয়, তিনি ৮০৩ সালে কুফায় গৃহবন্দি অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন। হাজী খলিফার মতে, তিনি ৭৭৬ সালে ইন্তেকাল করেছেন। হাজী খলিফা প্রদত্ত তার মৃত্যুর তরিখ তার জন্ম তারিখের মতোই ভূল। সব বিষয় বিবেচনা করে অধ্যাপক হোমইয়ার্ড এ সিদ্ধান্তে পৌঁছান যে, জাবির খুব সম্ভব ৭৩০-৩৫ সালের মধ্যে জন্ম নিয়েছিলেন এবং ৮২৫ সালে ৮০ বছর বয়সে এ নশ্বর পৃথিবী থেকে বিদায় গ্রহন করেন। মৃত্যুর সময় তার বালিশের নিচে ‘কিতাব আল-রহমাহ’র একটি কপি পাওয়া গিয়েছিল।

2 comments:

  1. This is a true scientist that dedicated all his life to study the mysteries of our world, and I hope that his name will never be forgotten.

    ReplyDelete
    Replies
    1. Thank's.
      Please Stay With Us For Gather Much Knowledge.

      Delete

Theme images by nickfree. Powered by Blogger.