বায়তুল হিকমাহ (House of Wisdom)

বায়তুল হিকমাহ

বায়তুল হিকমাহ (House of Wisdom) ছিল আব্বাসীয় যুগে বাগদাদের একটি লাইব্রেরি ও অনুবাদ কেন্দ্র। বায়তুল হিকমাহ শব্দটি ছিল ফারসি ‘খানি-আয়ে দানিশ’ - এর একটি প্রতিশব্দ। পারস্যে শাষণ আমলে লাইব্রেরিকে ‘খানি-আয়ে দানিশ’ বলা হতো। ফারসি থেকে আরবী ভাষায়  অনুবাদ এবং অনূদিত গ্রন্থগুলো সংরক্ষণ করা ছিল বায়তুল হিকমাহ প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য। বায়তুল হিকমাহ প্রতিষ্ঠা করা না হলে ইসলামের ইতিহাসে স্বর্ণযুগ নামে কোন গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়ের সূচনা ঘটতো কিনা সন্দেহ। মানব জাতির ইতিহাস হতো ভিন্নতর। এ প্রসঙ্গে সাংবাদকি ও লেখক জোনাথন লিয়ন্সের একটি উক্তি উল্লেখযোগ্য। তিনি তার ‘দ্যা হাউজ অব উয়িউডম: হাউ দি অ্যারাবস ট্রান্সফরমড দ্য ওয়েস্ট’ শিরোনামে পুস্তকের ১৩ নম্বর পৃষ্ঠায় লিখেছেন, The classical works of Greek and other ancient philosophers and scientist might have been lost to the European if they had not been preserved in the Ariabic language through the Houe of Wisdom. Muslims translated them and also wrote comments and explanations and added their own idesa.
অর্থাৎ ‘হাউজ অব উয়িজডমের মাধ্যমে গ্রীক ও অন্যান্য প্রাচীন দার্শনিক ও বিজ্ঞানীর প্রাচীন গ্রন্থগুলো আরবী ভাষায় সংরক্ষণ করে রাখা না হলে ইউরোপীয়দের কাছ থেকে সেগুলো হারিয়ে যেতো। মুসলমানরা প্রাচীন গ্রন্থগুলো অনুবাদ করেছেন এবং অনূদিত গ্রন্থগুলোর ওপর ভাষ্য ও ব্যাখ্যা লিখেছেন এবং তার সঙ্গে নিজেদের ধারণা অন্তর্ভূক্ত করেছেন।’


গণিতের ঐতিহাসিক করোনা ব্রিজাইনা-ও একই কথা বলেছেন। তিনি তার ‘আল-খাওয়ারিজমি: দি ইনভেন্টার অব এলজাব্রা’ শিরোনামে গ্রন্থের ২১ নম্বর পৃষ্ঠায় লিখেছেন, The scholars of the House of Wisdom were instrumental in translating scientific texts from various cultures such as ancient Greece and India into Arabic and preserved them for future generations. অর্থাৎ ‘হাউজ অব উয়িজডমের পণ্ডিতগণ ছিলেন গ্রীস ও ভারতের মতো বিভিন্ন প্রাচীন সংস্কৃতির বৈজ্ঞানিক পাণ্ডুলিপিগুলো আরবীতে অনুবাদের সহাহয় শক্তি এবং তারা এসব অনুবাদ ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্য সংরক্ষণ করে রেখেছেন।’
৭৬২ সালে আব্বাসীয় খলিফা আল-মনসুর বাগদাদ নগরী প্রতিষ্ঠা করে তাকে রাজধানীর মর্যাদা দেন। তিনি নয়া রাজধানীকে একটি বুদ্ধিবৃত্তিক কেন্দ্র হিসাবে গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। উমায়ইয়া আমালের রাজধানী দামেস্ক দেশ বিদেশের জ্ঞানী গুণীদের আকৃষ্ট করতে ব্যর্থ হলেও বাগদাদ সফল হয়। 
বাগদাদের সরকারী নাম ছিল ‘মদিনা তুস-সালাম’। পার্সী জ্যেতির্বিজ্ঞানী আল-নওবখত এবং মিসরীয় ইহুদী জ্যেতির্বিজ্ঞানী মাশাল্লা ইবনে আসারি আল-বাসরির পরামর্শ অনুযায়ী নগরীর নকশা প্রণয়ন করা হয়। প্রাচীন বেবিলন নগরী যেখানে ছিল ঠিক সেখানে বাগদাদ নগরী প্রতিষ্ঠা করা হয়। তখনকার পৃথিবীর সবচেয়ে সমৃদ্ধ নগরী বাগদাদের লোকসংখ্যা ছিল ১০ লাখের বেশি। লোকসংখ্যা বিচারে এ নগরী ছিল বিশ্বের বৃহত্তম শহর। বাদদাদের রাজপথগুলো ছিল পীচঢালা। ঐশ্বর্য, বৈভব, প্রাচুর্য ও সুষমায় বাগদাদ রূপকথার স্বপ্নপুরীতে পরিণত হয়। এ নগরীর অপরূপ সৌন্দর্য নিয়ে রচিত হয় অমর সাহিত্য কর্ম ‘আরিব্য রজনী’। খলিফা আল-মনসুর প্রতিষ্ঠিত গোলাকার বাগদাদের এক-তৃতীয়াংশের ওপর নির্মিত সুরম্য রাজপ্রাসাদ, সুসজ্জিত হেরেম, জাঁকজমকপূর্ণ দরবার কক্ষ, নয়নাভিরাম মিলনায়তন এবং আমির উমরাহদের প্রাসাদ সারা বিশ্বের বিস্ময় উৎপাদন করেছিল। শহরের কেন্দ্রস্থলে ছিল খলিফার প্রাসাদ ‘দার আল-খলিফা’ এবং বসরা, কুফা, খোরাসান ও সিরিয়া অভিমুখী ছিল চারটি প্রবেশদ্বার। আব্বাসীয় খলিফাদের পারস্যের প্রতি ঝোঁক থাকায় পার্সীয় শাষনীয় সাম্রাজ্যের বহু রীতিনীতি গ্রহণ করা হয়। বিদেশী গ্রন্থ অনুবাদ করা ছিল এসব ঝোঁকের অন্যতম। এ উদ্দেশ্যে খলিফা আল-মনসুর শাষণীয় রাজকীয় লাইব্রেরির অনুকরণে একটি প্রাসাদ লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠা করেন। 
ইসলামের স্বর্ণযুগে বায়তুল হিকমাহকে বুদ্ধিবৃত্তিক আন্দোলনের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে বিবেচনা করা হতো। আল-মনসুরের পৌত্র আব্বাসীয় খলিফা হারুনুর রশীদ বাগদাদে এই লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠা করেন। তবে বায়তুল হিকমাহর প্রকৃত প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন তার সুযোগ্য পুত্র ও তার উত্তরাধিকারী খলিফা আল-মামুন। মামুনের আমলে এ প্রতিষ্ঠানের উন্নতি চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছে। ৮২৮ সালে খলিফা মামুন বাগদাদে শামসিয়া মানমন্দির প্রতিষ্ঠা করেন। বায়তুল হিকমাহ এর সঙ্গে শামসিয়া মানমন্দিরের সম্পর্ক ছিল। মামুন ছিলেন আব্বাসীয়দের মধ্যে শ্রেষ্ঠ খলিফা। তিনি প্রাচীন গ্রীক পাণ্ডুলিপিগুলো অনুবাদ এবং বিজ্ঞান নিয়ে গবেষণা করার জন্য খ্যাতনামা পণ্ডিতদের বায়তুল হিকমাহয় একত্রিত করেন। তার রাজত্বকালে বায়তুল হিকমাহ ছাড়া আরো অনেক লাইব্রেরি গড়ে তোলা হয়। বাইজন্টাইন সাম্রাজ্যে নিগৃতীত পণ্ডিতদেরও সসম্মানে ঠাঁই দেয়া হয়। স্বর্ণযুগে মুসলিম বিজ্ঞানীদের পাশাপাশি অমুসলিম বিজ্ঞানীরাও অসামান্য অবদান রেখেছেন। 

অমুসলিমদের প্রতি উদারতাঃ 

মাশাল্লা ইবনে আসারি আল-বাসরি, সহল ইবনে বিসর, আবুল তায়েব, হুনায়ন ইবনে ইসহাক, সহল ইবনে তাবারি, ইয়াহিয়া ইবনে সারাফিউন, জিবরাইল ইবনে বুখতায়িশু, ইউহান্না ইবনে মাসিয়াহ, ইসহাক ইবনে ইমরান ও ময়মনিদাসের মতো বহু অমুসলিম বিজ্ঞান সাধনায় নিজেদের বিলিয়ে দিয়েছেন। ১৯৩৫, ১৯৭০, ১৯৭৬ ও ১৯৯৫ সালে মোট চার দফায় স্বর্ণযুগের ২৪ জন মুসলিম বিজ্ঞানীর নামে চাঁদের ২৪ টি গহ্ববরের নামকরণ করা হয়। যে ২৪ জন আরব বিজ্ঞানীর নামে চাঁদের গহ্ববরের নামকরণ করা হয়েছে ইহুদী জ্যেতির্বিজ্ঞানী মাশাল্লা হলেন তাদের অন্যতম। চাঁদের ৩৯ দশমিক ২ এন দ্রাঘিমাংশ এবং ৬০ দশমিক শূন্য পাঁচ ই অক্ষাংশে ও গহ্বরের দৈর্ঘ্য ১২৫ দশমিক শূন্য পাঁচ কিলোমিটার। সহল ইবনে বিসরও ছিলেন বিজ্ঞানী মাশাল্লার মতো একজন ইহুদী। তার পূর্ণ নাম সহল ইবনে বিসর ইবনে হাবিব ইবনে হানি আবু ওসমান। ইহুদী হলেও তিনি বাগদাদের রাজদরবারে সমসাময়িক মুসলিম বিজ্ঞানীদের সমান মর্যাদা ভোগ করতেন। বাগদাদে আসার আগে তিনি খোরাসানে অবস্থান করছিলেন। সেখানেও তিনি জ্যের্তিবিজ্ঞানী হিসাবে খ্যাতি লাভ করেন। আবুল তায়েব প্রথম জীবনে  ইহুদী হলেও পরে ইসলাম গ্রহণ করেন। তার পূর্ণ নাম আবুল তায়েব সনদ ইবনে আলী। হুনায়ন ইবনে ইসহাক ছিলেন একজন খ্রিস্টান আরব চিকিৎসক। তিনি কখনো ইসলাম গ্রহণ করেননি। অনুবাদক হিসাবে তার কোন জুড়ি ছিল না। তার পূর্ণ নাম আবু সাঈদ হুনায়ন ইবনে ইসহাক আল-ইবদী। ল্যাটিন ভাষায় তিনি ‘হুমাইনা’ (Humainus) হিসেবে পরিচিত। হুনায়ন ৯৫ টি গ্রীক পাণ্ডুলিপি সিরীয় ভাষায় এবং ৩৯ টি আরবীতে অনুবাদ করেন। 

বায়তুল হিকমাহ থেকে আলোর বিচ্ছুরণঃ

বায়তুল হিকমাহ তৎকালীন বিশ্বে জ্ঞান বিজ্ঞান সাধনায় একটি অপ্রতিদ্বন্দ্বী গবেষণা কেন্দ্রে পরিণত হয়। এখানে গণিত, জ্যেতির্বিজ্ঞান, চিকিৎসা বিজ্ঞান, আলকেমি, রসায়ন, প্রাণিবিদ্যা ও ভূগোল নিয়ে গবেষণা করা হতো। আরবগণ দু’টি সূত্র থেকে তাদের গাণিতিক জ্ঞান লাভ করেন। একটি সূত্র ছিল ভারতীয় হিন্দু এবং আরেকটি ছিল গ্রীক। গ্রীক পাণ্ডুলিপি হস্তগত করতে আব্বাসীয় খলিফাগণ কোন চেষ্টার ত্রুটি করেননি। আব্বাসীয় আমলে যেসব গ্রীক পণ্ডিতের গ্রন্থাবলী আরবীতে অনুবাদ করা হয় তদের মধ্যে ছিলেন পিথাগোরাস, প্লেটো, এরিস্টেটাল, হিপোক্রেটস, প্লাটিনাস, গালেন, ইউক্লিড, টলেমি, এন্টোলিসকাস, এরিস্টারকোস, আর্কিমিডিস প্রমুখ। যেসব ভারতীয় মনীষীর গ্রন্থ আরবীতে অনুবাদ করা হয় তাদের মধ্যে ছিলেন সুশ্রুতা, চারকা, আর্যভট্ট ও ব্রহ্মগুপ্ত। জ্যেতির্বিজ্ঞানী ইব্রাহিম আল-ফারাজির উৎসাহে খলিফা আল-মনসুরের দরবারে ভারতীয় জ্যেতির্বিজ্ঞানী কঙ্কের ‘সিন্দহিন্দ’ নিয়ে আসা হয়। ‘সিন্দহিন্দ’ - এর আরেক নাম ছিল ‘সূর্যসিদ্ধান্ত’। ৭৬৭ সালে মনসুরের দরবারে কঙ্কের সঙ্গে আরবীয় জ্যেতির্বিজ্ঞানী ইয়াকুব ইবনে আরিফের সাক্ষাৎ হয়। ৭৭২ সালে আবু আবদুল্লাহ মোহাম্মদ ইব্রাহিম আল-ফাজারি সংস্কৃতথেকে আরবীতে ‘সূর্যসিদ্ধান্ত’ অনুবদ করেন। গণিতজ্ঞ জি. সারটনের মতে, এ অনুবাদের মধ্যে দিয়ে হিন্দু সংখ্যা লিখন পদ্ধতি ভারত থেকে ইসলামে স্থানান্তরিত হয়। চিকিৎসাবিদ আবু ইয়াহিয় টলেমির ‘টেট্রাবিবলোস’ (Tetrabiblos) অনুবাদ করেছিলেন। ইউক্লিডের মৃত্যুর পর গণিতের ওপর তার লিখিত কর্মগুলো চামড়ার কাগজে শুকনো পুঁথির মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। ছোট ছোট খণ্ডে (Biblia) বইগুলো লেখা হয়। আরব অনুবাদক আল-মাহানি সর্বপ্রথম ইউক্লিডের পঞ্চম ও দশম খন্ড অনুবাদ করেন। তিনি ইউক্লিডের দুর্বোধ্য কর্মগুলো অনুবাদ না করলে তার নাম ইতিহাস থেকে মুছে যেতো। 
বায়তুল হিকমায় প্রথম অনুবাদ করা হয়েছিল পহলভী ভাষার গ্রন্থ। পরে সিরীয় এবং আরো পরে গ্রীক ও ভারতীয় গ্রন্থ। বায়তুল হিকমাহর পণ্ডিতগণ গ্রীক বিজ্ঞানী আর্কিমিডিসের ১১ টি গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ  অনুবাদ করেন। অনূদিত বইগুলোর মধ্যে জলঘড়ি নির্মাণ সংক্রান্ত একটি গ্রন্থও ছিল। এছাড়া পারসার নিকোমাকাসের ‘অন দ্যা ম্যাথমেটিক্যাল থিওরি’ (On the Mathematical theory), ত্রিপোলির থিওডোসিয়াস, এপোলনিয়াস পারগাসাস, থিওন ও মেনিলাসের মতো গণিতজ্ঞদের গ্রন্থও অনুবাদ করা হয়। নবম শতাব্দীর শেষ নাগাদ অধিকাংশ গ্রীক পাণ্ডুলিপি অনুবাদ করার কাজ শেষ হয়। বায়তুল হিকমায় কর্মরত মুসলিম পণ্ডিতগণ বেবিলনীয় ও হিন্দু গণিতের ওপর প্রাপ্ত পাণ্ডুলিপিও অনুবাদ করেন। আরব পণ্ডিতগণ বিশ্বের জ্ঞান ভান্ডারের এক বিশাল সংগ্রহ গড়ে তোলেন। এ জ্ঞান ভাণ্ডারের সহায়তার তারা নিজস্ব উদ্ভাবনে সক্ষম হন। বায়তুল হিকমাহ এবং অন্যান্য লাইব্রেরিতে ক্যাটালগ ধারণা চালু করা হয়। লাইব্রেরিগুলোতে বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে বইগুলো সাজিয়ে রাখা হতো। লাইব্রেরির আশপাশে বিপুলসংখ্যক স্টেশনারি দোকান খোলা হয়। স্টেশনারি দোকানগুলো বুকশপ হিসাবেও কাজ করতো। ‘আল-নাকিম’ ছিল বৃহত্তম দোকান। আল-নাকিমে প্রতিদিন হাজার হাজার বই বিক্রি হত। বায়তুল হিকামাহ একটি শিক্ষা কেন্দ্র হিসাবে সুপরিচিত হয়ে উঠে। তবে আমাদের আজকের যুগের মতো তা কোন বিশ্ববিদ্যালয় ছিল না। শিক্ষকদের কাছথেকে ছাত্ররা সরাসরি শিক্ষা লাভ করতো। নবম শতাব্দীতে বাগদাদে মক্তব গড়ে উঠতে থাকে। একাদশ শতাব্দীতে নিজাম উল-মুলক ‘আল-নিজামিয়া অব বাদদাদ’ প্রতিষ্ঠা করেন। 

খলিফা আল-মামুনঃ

খলিফা আর-মামুনের মা মারজিল পার্সী হওয়ায় তিনি আরবদের বিজ্ঞান সাধনায় পারস্যের সহযোগিতার গুরুত্ব উপলব্ধি করতে সক্ষম হয়েছিলেন। খলিফা হারুনুর রশীদের উপপত্নী মারাজিলকে যুদ্ধবন্দি হিসাবে বাগদাদে নিয়ে আসা হয়েছিল। তার পিতা বিদ্রোহী নেতা ওসতাছ সিজ খোরাসানে আব্বাসীয়দের  সঙ্গে ‍যুদ্ধে পরাজিত হলে বাপ বেটি বন্দি হন। মারাজিলকে দাসী হিসাবে খলিফা হারুনুর রশীদের পাকমালায় পাঠানো হয়। একদিন সম্রাজ্ঞী জুবায়দা স্বামী হারুনুর রশীদের সঙ্গে দাবা খেলার সময় শর্ত দেন যে, খেলায় হেরে গেতে তাকে পাকশালার সবচেয়ে কুৎসিত ও কদাকার দাসীর সঙ্গে রাত কাটাতে হবে। খলিফা হারুন দাবা খেলায় হেরে যান। সম্রাজ্ঞী জুবায়দা খেলার শর্ত মেনে নিতে তাকে চাপ দেন। হারুনুর রশীদ অনেক পীড়াপীড়ি করেন। কিন্তু তাকে সম্রাজ্ঞী জুবায়দার কাছে ঘাট মানতে হয়। সেদিন থেকে দিনি মারাজিলের সঙ্গে রাত কাটাতে থাকেন। অচিরে মারাজিল গর্ভবতী হয়ে পড়েন। হরুনুর রশীদের সিংহাসনে আরোহনের বছর মামুনের জন্য হয়। তার নাম রাখা হয় ‘আব্দুল্লাহ’। মামুনের জন্মের পরেই মারাজিল ইন্তেকাল করলে পার্সী বারমাকি পরিবার তাকে লালন পালন করে। তার জন্মের ৬ মাস পর সম্রাজ্ঞী জুবায়দা পুত্র সন্তানের মা হন। এ পুত্রে নাম রাখা হয় আল-আমিন। জুবায়দা ছিলেন বিশুদ্ধ আরব। সম্পর্কে তিনি ছিলেন হারুনুর রশীদের চাচাতো বোন। স্বাভাবিকভাবে সিংহাসনের প্রতি আল আমিরেন দাবি ছিল অগ্রগণ্য। কিন্তু খলিফা হারুন আদর করতেন বেশি মরারজিলের পুত্র মামুনকে। বিতার স্নেহধন্য মামুন কলিফা হয়ে আরবদের চেয়ে পার্সীদের প্রাধান্য দিতে শুরু করেন। 
এ. বারটোল্ড স্পালার ‘দ্যা মুসলিম ওয়াল্ড: দি এজ অব দ্যা ক্যালিফ’ - এর এক নম্বর ভলিউমে পার্সীদের প্রতি মামুনের গভীর অনুরাগের বর্ণনা দিয়েছেন। মামুনের উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি লিখেছেন, ‘The Persians ruled for a thousnad years and did not need us Arabs even for a day. We have been ruling them for one or two centuries and cannot do without them for an hour.’ অথ্যাৎ ‘পার্সীরা হাজার বছর শাসক করেছে এবং এসময় আমাদের আরবদের তাদের একদিনের জন্যও প্রয়োজন হয়নি। আমারা তাদের শাসন করছি মাত্র এক কিংবা দু’শো বছর ধরে এবং আমরা তাদের ছাড়া এক ঘন্টাও চলতে পারবো না।’
পিতা হারুনুর রশীদের নির্দেশে মামুন পবিত্র কোরআন মুখস্থ করেন এবং রাজদরবারে ধর্মীয় পণ্ডিতদের সামনে ছত্রে ছত্রে কোরআনের মুখস্থ পাঠ দেন। কোরআন হেফজ করায় মামুনের মধ্যে বুদ্ধিবৃত্তিক যোগ্যতার স্ফূরণ ঘটে এবং প্রকৃতি সম্পর্কে তার অনুসন্ধিৎসা জাগে। 
৮৩০ সালে খলিফা আল-মামুন ২ লাখ দিনার ব্যায়ে বায়তুল হিকমাহ প্রতিষ্ঠা করেন। তার পৃষ্ঠপোষকতায় বায়তুল হিকমাহর কার্যক্রমে গুণগত পরিবর্তন সূচিত হয়। মামুন দামেস্কের উপকন্ঠে একটি মানমন্দির প্রতিষ্ঠা করেন। তারপর দ্রুত প্রতিষ্ঠা করা হয় আরো ৩০ টি মানমন্দির। খলিফা আল-মামুন বাইজাইন্টান সাম্রাজ্যের কাছ থেকে গ্রীক বৈজ্ঞানিক ও দার্শনিক পাণ্ডুলিপি সংগ্রহ করেন। তিনি পূর্ব বাইজান্টাইন সম্রাট তৃতীয় মাইকেলের কাছে সন্ধির যেসব শর্ত দিয়েছিলেন সেগুলো মধ্যে কন্সটান্টিনোপালের রাজকীয় লাইব্রেরি তেকে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক গ্রীক পাণ্ডুলিপি হস্তান্তর করার শর্তও ছিল। 
মামুন বৈজ্ঞানিক পাণ্ডুলিপি সংগ্রহে বাইজান্টাইন সম্রাট লিও দ্যা আর্মেনিয়ানের কাছে ইবনে মাসবাহ ও হুনায়ন ইবনে ইসহাকের নেতৃত্বে একটি কূটনৈতিক মিশন পাঠিয়েছিলেন। তিনি যাদের সঙ্গে লড়াই করতেন এবং লড়াইয়ে পরাজিত করে যাদের সঙ্গে সন্ধিসূত্রে আবদ্ধ হতেন তাদের কাছ থেকে নিঃশর্তে প্রাচীন পাণ্ডুলিপি সংগ্রহ করতেন। তার আমলে মুসলিম বিজ্ঞানীরা গণিত ও জ্যের্তিবিজ্ঞানের প্রতি তাদের মনোযোগ কেন্দ্রীভূত করেন। 
ফারসি পাণ্ডুলিপির পরিবর্তে গ্রীক পাণ্ডুলিপি অনুবাদের ওপর জোর  দেওয়া হয়। খলিফা আল-মামুন গ্রীক, সিরীয় ও কালদীয় ভাষায় লিখিত পাণ্ডুলিপিগুলো অনুবাদ করার দায়িত্ব দেন লিউকের পুত্র কোস্টাকে, সংস্কৃত ভাষায় লিখিত ভারতীয় জ্যের্তিবিজ্ঞান বিষয়ক গ্রন্থগুলো অনুবাদ করার দায়িত্ব দেন মানকাহ ও দূবান নামে দু’জন ভারতীয় ব্রাক্ষণ পণ্ডিতকে এবং ফারসি ভাষায় লিখিত পুস্তকগুলো অনুবাদ করার দায়িত্ব দেন ইসা বিন এহিয়া ও মুসা বিন খালিদকে। মামুন প্রত্যেক অনুবাদককে মাসে ৫০০ দিনার ককরে পারিশ্রমিক দিতেন। হুনায়ন ইবনে ইসহাককে দিতেন অনূদিত বইয়ের সমপরিমাণ স্বর্ণমুদ্রা। 
মামুনের আমলে বায়তুল হিকমাহ পরিচালনার দায়িত্ব পালন করেন কবি ও জ্যের্তিবিজ্ঞানী সহল ইবনে হারুন। লাইব্রেরির সঙ্গে আরো যারা সংশ্লিষ্ট ছিলেন তাদের মধ্যে রয়েছেন মোহাম্মদ ইবনে ইসহাক আল-কিন্দি। খলিফা মামুন খ্রিষ্টান পণ্ডিত হুনায়ন ইবনে ইসহাকের কাছে অনুবাদের সার্বিক দায়িত্ব অর্পন করেছিলেন। সবচেয়ে বিখ্যাত অনুবাদক ছিলেন সাবীয় জ্যের্তিবিজ্ঞানী ছাবেত ইবনে কোরা। এসময় অনুবাদের মান ছিল পূর্ববর্তী সময়ের তুলনায় উন্নততর। নতুন নতুন ধারণা গুরুত্বপূর্ণ হিসাবে বিবেচিত হওয়ায় অনুবাদের ওপর কম জোর দেওয়া শুরু হয়। প্রায় এক শতাব্দী অনুবাদ কর্মের কাজ স্থায়ী হয়। পরে শুরু হয় মৌলিক আরবী গ্রন্থ রচনা।
খলিফা মামুন নিজে বিজ্ঞানী না হলেও বিজ্ঞান সাধনায় বিজ্ঞানীদের সুযোগ করে দেন। ইরাটোসথেনিস ছিলেন আলেক্সান্ড্রিয়ার একজন বিখ্যাত পণ্ডিত এবং প্রাচীনকালের একজন খ্যাতনামা ভূগোলবিদ। তিনি পৃথিবরি পরিধি ও ব্যাসার্ধ পরিমাপের একটি পদ্ধতি উদ্ভাবন করেছিলেন। ৮২৯ সালে খলিফা আল-মামুনের নির্দেশে ইরাটোসথেনিসের উদ্ভাবিত পদ্ধতি প্রয়োগ করা হয়। পরবর্ত কয়েক বছর একই পদ্ধতির পুনরাবৃত্তি ঘটানো হয়। এ পদ্ধতি প্রয়োগ করতে গিয়ে খলিফা মামুনের জ্যের্তিবিজ্ঞানীরা উল্লেখ করেন যে, সীনে (আসোয়ান) সূর্য যখন মধ্য দিগন্তে অবস্থান করে ঠিকক তখ আলেকক্সান্ড্রিয়ায় সূর্য মধ্য দিগন্তের ৭ ডিগ্রি ১২′ দক্ষিণে অবস্থান করে। এই পর্যবেক্ষণ থেকে তারা এ সিদ্ধান্তে পৌঁছান যে, ভূপৃষ্ঠে আলেক্সান্ড্রিয়ার অবস্থান সীনের ৭ ডিগ্রি ১২′  উত্তরে। দু’টি স্থানের মধ্যকার দূরত্ব ৫ হাজার স্টাডিয়া হওয়ায় ৩৬০ ডিগ্রি বৃত্তের এক-পঞ্চমাংশ হিসাব করে জ্যেতির্বিজ্ঞানীরা বের করেন যে, পৃথিবীর পরিধি ২০ হাজার ৪০০ মাইল এবং ব্যাসার্ধ সাড়ে ৬ হাজার মাইল। ভূমিতিক পরিমাপের সময় পৃথিবীর দৈর্ঘ্যের এ পরিমাপ করা হয়। এতে মেরিডিয়ানের  এক ডিগ্রি পরিমাপ করা হয় ৫৬×২/৩ মাইল। বর্তমান পরিমাপের চেয়ে এ পরিমাপ ছিল মাত্র আধা মাইল বেশি। মামুনের জ্যেতির্বিজ্ঞানীরা ক্রান্তিবৃত্তের আনতির মান ২৩ ক্র ৩৩′ খুঁজে পান।
ইয়াহিয়া ইবনে আবি মনসূর ও আল-খাওয়ারিজমি খলিফা আল মামুনের নির্দেশে বাদদাদের মানমন্দিরে পর্যবেক্ষণ চালান। কিন্তু সূর্যের সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন উচ্চতায় বিরাট পার্থক্য দেখতে পেয়ে মানুন তাদের পর্যবেক্ষণের ফলাফল প্রত্যাখ্যান করেন। ইয়াহিয়ার মৃত্যুর পর মামুন দামেস্কের কাছে একটি পাহাড় দিয়ার মুরানে নতুন করে পর্যবেক্ষণ চালানোর সিদ্ধান্ত নেন। খালিদ ইবনে আবদ আল মালিক আল-মারওয়ারুদ্দিনকে এক বছরের মধ্যে নতুন যন্ত্রপাতির সাহায্যে পর্যবেক্ষণ চালানোর দায়িত্ব দেন। কিন্তু পর্যবেক্ষণের সময় একটু বেশি লেগে যায়। ৮৩১ সাল থেকে ৩৮৮ সালের মধ্যে দু’টি পর্যায়ে পর্যবেক্ষণ চালানো হয়। খলিফা মামুন এ পর্যবেক্ষণের ফলাফলে সন্তুষ্ট হন এবং তার ভিত্তিতে জ্যেতির্বিজ্ঞান বিষয়ক সারণী তৈরির নির্দেশ দেন। জ্যেতির্বিজ্ঞানে এসব অবদানের স্বীকৃতি হিসাবে ইন্টারন্যাশনাল এস্ট্রোনমিক্যাল অর্গানাইজেশন (আই এ ইউ) তার নামে চাঁদের একটি গহ্ববরের নামকরণ করে।

বায়তুল হিকমাহর চূড়ান্ত উন্নতিঃ

খলিফা মামুনরে উত্তরসূরি আল-মুতাসিম ও আল-ওয়াছিতের আমলে বায়তুল হিকমাহর আরো উন্নতি হয়। তবে খলিফা আল-মুতাওয়াক্কিলের আমলে তার অবনতি ঘটে। খলিফা মামুন, আল-মুতাসিম ও আল-ওয়াছিত মুতজিলা মতবাদে বিশ্বাসী হলেও খলিফা মুতাওয়াক্কিল ছিলেন এ মতবাদের বিরোধী। কট্টর ইসলামের অনুসারী হওয়ায় খলিফা মুতওয়াক্কিল মুতজিলা মতবাদের উৎস গ্রীক দর্শনের বিস্তার রোধ করার চেষ্টা করেন।

বায়তুল হিকমাহ ধ্বংসঃ

একাদশ ও দ্বাদশ শতাব্দীতে ইউরোপীয় খ্রিস্টানদের পরিচালিত ক্রুসেডে ইসলামী খিলাফত দুর্বল হয়ে যায়। ত্রয়োদশ শতাব্দীতে আকস্মিকভাবে পূর্বদিক থেকে আব্বাসীয় সাম্রাজ্যের প্রতি বৃহত্তর হুমকি সৃষ্টি হয়। ১২০৬ সালে চেঙ্গিস খাঁর নেতৃত্বে মোঙ্গলরা মধ্য এশিয়ায় সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করে। মোঙ্গল সাম্রাজ্য পূর্বদিকে চীন এবং পশ্চিম দিকে রাশিয়া ও ইসলামী খিলাফতসহ ইউরোশিয়ার বিশাল ভূখণ্ডে সম্প্রসারিত হয়। ১২৫৩ সালে চেঙ্গিস খাঁর নাতি হালাগু খাঁ একটি বিশাল বাহিনী নিয়ে পারস্য অভিযান শেষে গুপ্তঘাতকদের সুরক্ষিত আলামুত দুর্গ আক্রমণ করেন। এ অভিযানে তিনি বাগদাদের খলিফা মুতাসিম বিল্লাহর সহায়তা কামনা করে তার কাছে একটি চিঠি পাঠান। খলিফা তার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করলে হালাও খাঁ ক্রদ্ধ ও অপমানিত বোধ করেন এবং গুপ্তঘাতক সম্প্রদায়কে নিশ্চিহ্ন করে ১২৫৮ সালের জানুয়ারিতে বাগদাদের উপকন্ঠে পৌঁছে খলিফা মুতাসিম বিল্লাহকে আত্মসমর্পনের জন্য চরমপত্র দেন। মুতাসিম বিল্লাহ তার চরমপত্র উপেক্ষা করলে তিনি ৪০ দিন বাগদাদ অবরোধ করে রাখেন এবং প্রস্তর নিক্ষেপক ও জ্বলন্ত অগ্নির সাহায্যে এ সুরম্য নগরীর প্রাচীর বিধ্বস্ত করেন। হালাগু খাঁর বাগদাদ ধ্বংসের মধ্যে দিয়ে ইসলামের স্বর্ণযুগ শেষ হয়ে যায়। বাগদাদ অবরোধে এক থেকে ১৬ লাখ লোক নিহত হয়। তিনদিন পর্যন্ত বাগদাদে রক্তের স্রোত বয়ে যায়। ভীত সন্ত্রস্ত আব্বাসীয় খলিফা মুতাসিম বিল্লাহ আত্মসমর্পণ করেন। হালাগু খাঁ নেস্টেরীয় খ্রিস্টান স্ত্রী দোকুজ খাতুনের নির্দেশে বাগদাদের খ্রিস্টান এবং পার্সী মুসলিম জ্যেতির্বিজ্ঞানী নাসিরুদ্দিন তুসির অনুরোধে শিয়াদের রেহাই দেয়া হয়। খলিফা আবু জাফর আবদুল্লাহ আল-মামুন প্রতিষ্ঠিত হাউজ অব উইজডোমসহ সব লাইব্রেরি ধ্বংস করে দেয়া হয়। বায়তুল হিকমাহর ধ্বংস শুধু স্বর্ণযুগের যবনিকাপাত ঘটায় তাই নয়, এ ঘটনা ছিল গোটা মানব জাতির জন্য অপূরণীয় ক্ষতি।

স্বর্ণযুগে মুসলিম বিজ্ঞানীদের আবিষ্কার (সাহাদত হোসেন খান) গ্রন্থ হতে সংগৃহিত। 

2 comments:

  1. Places like this one are always full of the unique atmosphere of knowledge that was kept there for decades, too bad that wars destroyed such many wonderful places.

    ReplyDelete
    Replies
    1. Thank's For Your Valuable Comment. Please Stay With Us For More Information.

      Delete

Theme images by nickfree. Powered by Blogger.